মোঃ দিদারুল ইসলাম, ঢাকা মহানগর প্রেসক্লাবের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক ও
উপ-সম্পাদক, দৈনিক বর্তমান কথা
তিনি বলেন‘পাশ্চাত্যের প্রযুক্তি, মুনাফা, কলাকৌশল এবং সংস্কৃতি নিয়ন্ত্রণ করে বৈশ্বিক সংবাদ প্রবাহ’- ১৯৯৬ সালে বলে যাওয়া স্টুয়ার্ট হলের এই উক্তি আজও প্রযোজ্য। প্রযুক্তির উৎকর্ষতার ফলে বিশ্ব এখন আমাদের হাতের মুঠোয়। ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যমে মুহূর্তেই বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের যেকোনো তথ্য আমরা জানতে পারছি। ফলে বৈশ্বিক সাংবাদিকতার চর্চার জায়গাটি এখন আগের চেয়েও অনেক দ্রুততর এবং সহজতর।
কিন্তু বৈশ্বিক সংবাদ প্রবাহ এখনও আবর্তিত হয় পাশ্চাত্যের সমাজ ও সভ্যতাকে কেন্দ্র করেই। মার্কিন রাজনীতি, অর্থনীতি, এমনকি ফ্যাশন— এসব কিছুই মূলত গণমাধ্যমগুলোর চর্চার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। এমনকি সাংবাদিকতা শিক্ষার পাঠ্যবইগুলোও পাশ্চাত্যের লেখকদেরই দখলে। ইউরোপের উন্নত দেশগুলোও রয়েছে সেই তালিকায়।
দরিদ্র দেশগুলো তখনই গণমাধ্যমে জায়গা করে নিতে পারে যখন দেশটি বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দুর্ঘটনা কিংবা যুদ্ধের শিকার হয়। বলা যায়, বৈশ্বিক সংবাদের প্রবাহ ও প্রকৃতি এখনও অমসৃণ। উন্নত বিশ্বে বাংলাদেশ একসময় পরিচিত ছিল তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দারিদ্র্য এবং শিশুমৃত্যু এমন নানা নেতিবাচক সংবাদের শিরোনাম হিসেবেই পরিচিত ছিল বাংলাদেশ। কিন্তু বাংলাদেশ তার পূর্বের অবস্থান থেকে এখন অনেকটা শক্তিশালী। যদিও বর্তমানে বিশ্বের আর্থিক মন্দার প্রভাব এখানেও বিদ্যমান। তবুও উন্নত বিশ্বের গণমাধ্যমে বাংলাদেশের জায়গা কতটুকু বেড়েছে?
আমাদের দেশের গণমাধ্যমেও আমরা কোন দেশগুলোর সংবাদকে প্রাধান্য দিচ্ছি? ঘুরেফিরে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স— এসব দেশের নানা খবরে সয়লাব আমাদের আন্তর্জাতিক পাতা। এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত গণমাধ্যমগুলোতে যুদ্ধ-সাংবাদিকতা চর্চার অত্যধিক ঝোঁক লক্ষণীয়।
কিন্তু এই দেশগুলো ছাড়াও বিশ্বে এমন আরও অনেক দেশ রয়েছে যারা এখন দারিদ্র্যের কবলে ধুঁকছে কিংবা বলির পাঠা হচ্ছে কোনো শক্তিশালী রাষ্ট্রের। বিশ্বরাজনীতি বাদ দিলেও জলবায়ু ও পরিবেশ বিষয়ক যে সংকটের সম্মুখীন হতে চলেছি আমরা অদূর ভবিষ্যতে, তার দায়ও উন্নত বিশ্বের দেশগুলো এড়াতে পারবে না।
বৈশ্বিক সাংবাদিকতা আমাদের শিক্ষা দেয় কীভাবে বিশ্বে চলমান বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে আমরা কাজ করতে পারি, চিন্তা করতে পারি। বর্তমানে আন্তর্জাতিক সংবাদ বিষয়ক প্রতিবেদনের ক্ষেত্রে বিদেশি সংবাদ মাধ্যমগুলোর উপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা দেখা যায় এবং একধরনের কপি-পেস্ট প্রবণতা লক্ষণীয়। এর পরিবর্তে সাংবাদিকদের নিজস্ব মতামত ও বিশ্লেষণ সংবাদটিকে অনেক বেশি প্রাণবন্ত করে তুলতে পারে।
বৈশ্বিক সাংবাদিকতার চর্চার জায়গাটি অনেক বিস্তৃত। শুধুমাত্র উন্নয়নের মাপকাঠিতে বিবেচনা না করে বরং মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সাংবাদিকতার চর্চা সুফল বয়ে আনতে সক্ষম। সুদান কিংবা হাইতির একটি শিশুর বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে, যেমনটা একজন মার্কিন শিশুর রয়েছে। অভিবাসনের শিকার শিশু আইলান কুর্দির মৃতদেহের নির্মম ছবি বিশ্বে সাড়া ফেলেছিল। কিন্তু এমন লাখো শিশু রাজনীতি ও সংঘাতের রোষানলে পড়ে জীবন হারাচ্ছে।
গণমাধ্যমকেই দরিদ্র ও সাধারণ মানুষের হয়ে কথা বলতে হবে। এটির ব্যাপ্তি শুধুমাত্র নিজ দেশ বা গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং পুরো বিশ্বই এর অন্তর্ভুক্ত।
তবে, বৈশ্বিক সাংবাদিকতার চর্চার জায়গা থেকে সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জায়গাটিও একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
স্ক্যান্ডিনেভিয়া দেশগুলো বাদে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেই সাংবাদিকতার ক্ষেত্রটি চাপমুক্ত নয়। কখনও স্ব-আরোপিত সেন্সরশিপ, আইনের ঘোরটোপ, মনস্তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক চাপ— এসব কিছুর ভেতর দিয়েই যেতে হয় বেশিরভাগ দেশের গণমাধ্যমকে। এমনকি এশিয়ার উন্নত দেশ বলে পরিচিত জাপানেও গণমাধ্যম পুরোপুরি মুক্ত নয়। জাপানের জনপ্রিয় পাঁচটি দৈনিক পত্রিকার মধ্যে সংবাদ আধেয়ের বৈচিত্র্য কম, বরং পত্রিকা ও সম্প্রচার মাধ্যমের তুলনায় ম্যাগাজিন বেশি শক্তিশালী। স্ব-আরোপিত সেন্সরশিপের অন্যতম শিকার দেশটি।
বৈশ্বিক সাংবাদিকতার চর্চা তখনই ফলপ্রসূ হবে যখন বিশ্বের প্রতিটি দেশের গণমাধ্যমকে কণ্ঠরোধ না করে স্বাধীন ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজের সুযোগ দেওয়া হবে। পাশাপাশি তথাকথিত উন্নত দেশগুলোর সংবাদ প্রচারের মনোভাব থেকে বের হয়ে বিশ্বকে মানবিক ও সমতার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার মাধ্যমে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রটি আরও সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে বলে আশা করা যায়।