বিজ্ঞাপন প্রচারের নামে প্রায় ১৫ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে প্রিমিয়ার ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান এইচবিএম ইকবাল, তার দুই ছেলে, সাবেক সংসদ সদস্য আবদুস সালাম মুর্শেদী ও বজলুল হক হারুণসহ ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের ১৭ জনের বিরুদ্ধে ১১টি মামলা রুজুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
বুধবার (২৮ জানুয়ারি) দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে মামলাগুলোর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে সংস্থাটির মহাপরিচালক আক্তার হোসেন জানিয়েছেন।
দুদকের অনুসন্ধান অনুযায়ী, ২০২১–২০২২ সালে বিজ্ঞাপন প্রচারের নামে দেওয়া ১১টি কার্যাদেশের বিপরীতে মোট ১৫ কোটি ১৩ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়। এসব কার্যাদেশ বাস্তবায়নের নামে কাগজে-কলমে ব্যয় দেখানো হলেও প্রকৃতপক্ষে বড় অঙ্কের অর্থ কোনো বৈধ খাতে ব্যয় হয়নি।
মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন—দি প্রিমিয়ার ব্যাংক লিমিটেডের সাবেক চেয়ারম্যান এইচবিএম ইকবাল, তার দুই ছেলে ও ব্যাংকের পরিচালক মোহাম্মদ ইমরান ইকবাল ও মঈন ইকবাল, ব্যাংকের পরিচালক ও সাবেক এমপি আবদুস সালাম মুর্শেদী, আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি বজলুল হক হারুণ, ব্যাংকের পরিচালক শফিকুর রহমান, জামাল গুপ্ত আহমেদ, শায়লা শেলী খান, এএইচএম ফেরদৌস, নব গোপাল বণিক, শাহ মোহাম্মদ নাহিয়ান হারুন, স্বতন্ত্র পরিচালক কাইজার আহমেদ চৌধুরী, ইভিপি মোহাম্মদ তারেক উদ্দিন, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ আবুল হাশেম, ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম রিয়াজুল করিম, ডিএমডি ও ক্রয় কমিটির প্রধান সৈয়দ নওশের আলী এবং মাইন্ডট্রি লিমিটেডের এমডি ইকবাল আল মাহমুদ।
দুদকের অনুসন্ধানে জানা যায়, ‘মাইন্ডট্রি লিমিটেড’ নামের একটি বিজ্ঞাপনী ভেন্ডর প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে অর্থ আত্মসাতের একটি ধারাবাহিক কৌশল অনুসরণ করা হয়। ২০১১ সালের ৪ আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ পর্যন্ত এইচবিএম ইকবালের নির্দেশে মাইন্ডট্রি/মাইন্ডট্রি লিমিটেডের নামে বিজ্ঞাপন প্রচারের অগ্রিম হিসেবে মোট ৪৩৮ কোটি ৭১ লাখ ২৮ হাজার ৪৪৪ টাকা জমা দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে এসব অগ্রিম অর্থকে বৈধ দেখাতে বিভিন্ন সময় বিজ্ঞাপন প্রচারের কার্যাদেশ দেখিয়ে সমন্বয় করা হয়। এর মধ্যে ২০১১ সালের আগস্ট থেকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩৪২ কোটি ২৯ লাখ ৮৭ হাজার ৪৪৪ টাকা সমন্বয় দেখানো হলেও ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত ৯৬ কোটি ৪১ লাখ ৪১ হাজার টাকা এখনো অসমন্বিত রয়েছে।
দুদকের তদন্তে আরও উঠে আসে, ২০২১–২০২২ সালে প্রিমিয়ার ব্যাংকের বিজ্ঞাপন বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচারের জন্য মাইন্ডট্রিকে ১৯ কোটি ৮০ লাখ টাকার ১১টি কার্যাদেশ দেওয়া হয়। চুক্তি অনুযায়ী প্রতিটি চ্যানেলে ১০০ মিনিট করে বিজ্ঞাপন প্রচারের কথা থাকলেও বাস্তবে ট্রান্সমিশন সার্টিফিকেট অনুযায়ী মাত্র ৫০ মিনিট বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়।
ভেন্ডর প্রতিষ্ঠানের বিল, ভাউচার ও পে-অর্ডার পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১১টি কার্যাদেশের বিপরীতে প্রকৃতপক্ষে মাইন্ডট্রিকে দেওয়া হয়েছে মাত্র ৪ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। অবশিষ্ট ১৫ কোটি ১৩ লাখ টাকা কোনো বৈধ ব্যয়ে ব্যবহার না করে আত্মসাৎ করা হয় বলে অভিযোগ আনা হয়েছে।
এই ঘটনায় আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ও ১০৯ ধারাসহ দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪(২) ও ৪(৩) ধারায় মামলা রুজুর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, এর আগেও গত ৯ জানুয়ারি বিজ্ঞাপন প্রচারের নামে ৮ কোটি ১৭ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে একই ব্যক্তিদের মধ্যে কয়েকজনসহ মোট ১৫ জনের বিরুদ্ধে পাঁচটি মামলা অনুমোদন দিয়েছিল দুদক।