বুধবার , ১লা জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ১৭ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ - বর্ষাকাল || ১৬ই মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

ফুলে-ফুলে নতুন বছরের আহ্বান: খাগড়াছড়িতে শুরু পাহাড়ি বর্ষবরণ উৎসব

প্রকাশিত হয়েছে- রবিবার, ১২ এপ্রিল, ২০২৬

পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িসহ পুরো পাহাড়ি অঞ্চলে শুরু হয়েছে বৈচিত্র্যময় বর্ষবরণ উৎসব। চাকমা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী “ফুল বিজু” উদযাপনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এ উৎসবের সূচনা হয়েছে, যা পাহাড়জুড়ে এনে দিয়েছে আনন্দ, ঐতিহ্য আর সম্প্রীতির এক অনন্য আবহ।

রোববার (১২ এপ্রিল) ভোরের প্রথম আলো ফুটতেই খাগড়াছড়ির চেঙ্গী ও মাইনী নদীসহ আশপাশের ছড়া ও খালগুলোতে নেমে আসে উৎসবমুখর মানুষের ঢল। শহরের খবংপুড়িয়া ও রিভারভিউ পয়েন্ট এলাকায় ভোর থেকেই বিভিন্ন বয়সী মানুষ দলবদ্ধভাবে নদীর তীরে জড়ো হন। রঙিন ফুল হাতে তারা গঙ্গাদেবীর উদ্দেশ্যে নিবেদন করেন শ্রদ্ধা ও প্রার্থনা।

ফুল ভাসানোর এই আয়োজন শুধু একটি ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক আচার নয়; এটি পুরনো বছরের সব দুঃখ, কষ্ট ও গ্লানি দূর করে নতুন বছরের জন্য শান্তি, সমৃদ্ধি ও সুখ কামনার প্রতীক। নদীর বুকে ভাসতে থাকা ফুল আর দুই তীরের মানুষের উচ্ছ্বাসে সৃষ্টি হয় এক অপূর্ব নান্দনিক দৃশ্য, যা প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের মেলবন্ধনের এক জীবন্ত উদাহরণ।

নদীর তীরে অংশ নিতে আসা নুপুর চাকমা বলেন, “প্রতিবছরের মতো এবারও আমরা পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে এখানে এসেছি। গঙ্গা দেবীর উদ্দেশ্যে ফুল অর্পণ করে আমরা চাই, সবার জীবনে শান্তি ফিরে আসুক, সব দুঃখ দূর হোক।”

অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা সাধন কুমার চাকমা জানান, ফুল বিজুর মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া বিজু উৎসব আগামী ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত চলবে। এই সময়জুড়ে নানা আচার-অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা এবং পারিবারিক আয়োজনের মাধ্যমে বর্ষবরণ উদযাপন করা হবে।

ফুল ভাসানোর অনুষ্ঠান ঘিরে নদীর পাড়ে মানুষের ব্যাপক সমাগম ঘটে। স্থানীয় প্রশাসন ও বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরাও এতে অংশগ্রহণ করেন, যা উৎসবের গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে তোলে।

চাকমাদের মূল বিজু উদযাপিত হবে পরদিন, আর বাংলা নববর্ষের দিন পালিত হবে ‘গজ্জাপজ্জা’, যা নতুন বছরের আনুষ্ঠানিক সূচনা হিসেবে বিবেচিত।

এদিকে ত্রিপুরা সম্প্রদায় চৈত্র সংক্রান্তি থেকে শুরু করবে তিনদিনব্যাপী ‘বৈসু’ উৎসব। এতে থাকবে ‘হারিবৈসু’ দিনে ফুল পূজা, শিশুদের অংশগ্রহণে রিনাই-রিসা ভাসানো এবং ঐতিহ্যবাহী গরয়া নৃত্য।

অন্যদিকে মারমা সম্প্রদায়ের ‘সাংগ্রাইং’ উৎসবও শুরু হবে ১৪ এপ্রিল থেকে। তিনদিনব্যাপী এ আয়োজনে থাকবে বুদ্ধ পূজা, বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান জানাতে পবিত্র জল ঢালা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং আকর্ষণীয় পানি উৎসব ‘রি-আকাজা’, যেখানে সবাই একে অপরকে পানি ছিটিয়ে আনন্দ ভাগাভাগি করেন।

পার্বত্য অঞ্চলের এসব উৎসব কেবল আনন্দ উদযাপন নয়, বরং বহুজাতিক সংস্কৃতি, সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি। পাহাড়জুড়ে এখন উৎসবের আমেজ, যেখানে নতুন বছরের স্বপ্ন আর ভালোবাসায় ভরে উঠছে মানুষের মন।