রবিবার , ২৬শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ১১ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ - বর্ষাকাল || ১২ই সফর, ১৪৪৮ হিজরি

ফুটবলের ‘মহারণ’ আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড: ইতিহাস, প্রতিশোধ আর বিশ্বকাপ সেমিফাইনালের উত্তাপ

প্রকাশিত হয়েছে- রবিবার, ১২ জুলাই, ২০২৬

ক্রিকেটে যেমন ভারত-পাকিস্তান দ্বৈরথ, তেমনি ফুটবলে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের লড়াইও আবেগ, ইতিহাস ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার অনন্য প্রতীক। ২৪ বছর পর আবারও বিশ্বকাপের মঞ্চে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দল। আগামী বুধবার আটলান্টায় ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে মাঠে নামবে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড।

শেষ ষোলোর নাটকীয় জয়ের পর থেকেই আর্জেন্টিনা শিবিরে শুরু হয় ইংল্যান্ডবিরোধী আবহ। ড্রেসিংরুমে খেলোয়াড়দের কণ্ঠে শোনা যায় ইংল্যান্ডকে উদ্দেশ্য করে প্রচলিত স্লোগান। সমর্থকরাও যুক্তরাষ্ট্র ও বুয়েনস আইরেসের রাস্তায় ইংলিশবিরোধী স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠেন। যদিও তখনও সেমিফাইনালে প্রতিপক্ষ হিসেবে ইংল্যান্ড নিশ্চিত হয়নি।

কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডকে ৩-১ গোলে হারানোর পর সেই আবহ আরও তীব্র হয়। জয় উদযাপনের সময় আর্জেন্টাইন খেলোয়াড় ও সমর্থকদের কণ্ঠে ধ্বনিত হয় ঐতিহাসিক স্লোগান—“যে লাফাবে না, সে-ই ইংরেজ।” মাঠের লড়াইয়ের আগেই যেন শুরু হয়ে গেছে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ।

ফকল্যান্ড যুদ্ধের স্মৃতি, ফুটবলে প্রতিশোধের প্রতীক

আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড ম্যাচের পেছনে রয়েছে ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড (মালভিনাস) যুদ্ধের রক্তাক্ত ইতিহাস। দক্ষিণ আটলান্টিকের এই দ্বীপপুঞ্জের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ৭৪ দিনের যুদ্ধে দুই দেশের শত শত সেনা নিহত হন। সেই যুদ্ধের ক্ষত আর্জেন্টিনার মানুষের মনে আজও গভীরভাবে রয়ে গেছে, যার প্রতিফলন ফুটবল মাঠেও দেখা যায়।

ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ থেকে ‘শতাব্দীর সেরা গোল’

১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দিয়েগো ম্যারাডোনার দুটি গোল ফুটবল ইতিহাসে চিরস্মরণীয়। প্রথমটি বিতর্কিত ‘হ্যান্ড অব গড’, আর দ্বিতীয়টি মাঝমাঠ থেকে একক নৈপুণ্যে করা ‘শতাব্দীর সেরা গোল’। সেই ম্যাচে ২-১ ব্যবধানে জয় পেয়ে আর্জেন্টিনা পরে বিশ্বকাপ জেতে। ম্যারাডোনা নিজেই বলেছিলেন, এই জয় ছিল ফকল্যান্ড যুদ্ধে নিহত আর্জেন্টাইনদের প্রতি এক ধরনের ফুটবলীয় প্রতিশোধ।

১৯৬৬ সালের বিতর্কও বাড়িয়েছে বৈরিতা

দুই দেশের তিক্ত সম্পর্কের সূচনা আরও আগে। ১৯৬৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক আন্তোনিও রাতিনকে বিতর্কিত লাল কার্ড দেখানোর পর দুই দলের মধ্যে উত্তেজনা চরমে ওঠে। ম্যাচ শেষে ইংল্যান্ডের কোচ আলফ রামসে আর্জেন্টাইনদের নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করেন, যা দুই দেশের ফুটবল সম্পর্ককে আরও বৈরী করে তোলে।

প্রথমবার ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মেসি

লিওনেল মেসির দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে এই প্রথম ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মাঠে নামার সুযোগ এসেছে। তাই এই সেমিফাইনাল শুধু একটি বিশ্বকাপ ম্যাচ নয়, বরং আর্জেন্টাইনদের কাছে ম্যারাডোনার উত্তরাধিকার ধরে রাখার আরেকটি সুযোগ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

বিশ্বকাপে মুখোমুখি লড়াই

বিশ্বকাপ ইতিহাসে এখন পর্যন্ত পাঁচবার মুখোমুখি হয়েছে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। ১৯৬২ ও ১৯৬৬ সালে জয় পায় ইংল্যান্ড। ১৯৮৬ ও ১৯৯৮ সালে জয়ী হয় আর্জেন্টিনা। আর ২০০২ সালের গ্রুপ পর্বে ডেভিড বেকহ্যামের পেনাল্টি গোলে ১-০ ব্যবধানে জিতে প্রতিশোধ নেয় ইংল্যান্ড। এরপর ২০০৫ সালের পর দুই দল আর কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচে মুখোমুখি হয়নি।

২৪ বছর পর বিশ্বকাপের মঞ্চে আবারও এই দুই পরাশক্তির লড়াই ঘিরে ফুটবলপ্রেমীদের উত্তেজনা এখন তুঙ্গে। ইতিহাস, আবেগ ও শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে কে এগিয়ে যাবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।