ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বহুল আলোচিত ‘পর্দা কেলেঙ্কারি’ এবং সরঞ্জাম ক্রয়ে প্রায় ১০ কোটি টাকা আত্মসাতের চেষ্টার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় ১২ আসামির মধ্যে ছয়জনকে অব্যাহতি দিয়েছেন আদালত। এ ঘটনায় দীর্ঘদিনের আলোচিত মামলাটি নতুন মোড় নিয়েছে।
সোমবার (৬ এপ্রিল) দুপুরে ফরিদপুরের বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মো. শরিফউদ্দিন চার্জ গঠনের শুনানি শেষে এই আদেশ দেন। আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মামলায় অভিযুক্ত ১২ জনের মধ্যে ছয়জনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে এবং বাকি ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
যাদের অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, তারা হলেন— ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জিক্যাল বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মিজানুর রহমান, মেডিসিন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক শেখ আব্দুল ফাত্তাহ, ফরিদপুর সিভিল সার্জন অফিসের স্বাস্থ্য ও শিক্ষা বিষয়ক কর্মকর্তা মো. আলমগীর ফকির, গণপূর্ত বিভাগের সাবেক উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আব্দুস সাত্তার, হাসপাতালের সমাজসেবা কর্মকর্তা ওমর ফারুক এবং জাতীয় ইলেকট্রো-মেডিক্যাল যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের প্রকৌশলী মিয়া মোর্তজা হোসাইন।
অন্যদিকে, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তারা হলেন— শিশু বিভাগের সাবেক অধ্যাপক বরুণ কান্তি বিশ্বাস, ঠিকাদার মুনশী কাফরুল হুসাইন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স অনিক ট্রেডার্সের মালিক আব্দুল্লা আল মামুন, জাতীয় বক্ষব্যাধি হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মুন্সী সাজ্জাদ হোসাইন, সাবেক সিনিয়র কনসালটেন্ট (চক্ষু) এনামুল হক এবং মেসার্স আলী ট্রেডার্সের মো. আলমগীর কবির।
এর মধ্যে বরুণ কান্তি বিশ্বাস এবং মুনশী কাফরুল হুসাইন বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। বাকি চারজন জামিনে মুক্ত অবস্থায় আছেন।
মামলার পটভূমিতে জানা যায়, ২০১৫ সালে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউ ইউনিট চালুর জন্য প্রায় ১০ কোটি টাকার চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ করে মেসার্স অনিক ট্রেডার্স এবং মেসার্স আলী ট্রেডার্স। তবে বিল পরিশোধের সময় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বাজার যাচাইয়ে সরঞ্জামের অস্বাভাবিক মূল্য দেখতে পায়, যা পরবর্তীতে সন্দেহের সৃষ্টি করে।
বিষয়টি পরে হাইকোর্টের নজরে আসে এবং আদালত দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) তদন্তের নির্দেশ দেন। দুদকের প্রাথমিক তদন্তে সরঞ্জামের অতিরিক্ত মূল্য নির্ধারণের সত্যতা পাওয়া যায়, যার ফলে বিল স্থগিত রাখা হয়।
পরবর্তীতে ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর দুদকের সহকারী পরিচালক মো. মামুন উর রশিদ চৌধুরী বাদী হয়ে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন।
মামলার তদন্ত প্রক্রিয়ায় একাধিকবার পরিবর্তন আসে। ২০২৩ সালের ৯ জুলাই তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. ফরিদ হোসেন পাটোয়ারি নতুন করে ১৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেন। তবে ওই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ না করে পুনঃতদন্তের নির্দেশ দেন।
পরবর্তীতে পুনঃতদন্ত শেষে ২০২৫ সালের ৩১ আগস্ট দুদকের সহকারী পরিচালক মো. বেনজীর আহমেদ ১২ জনকে আসামি করে নতুন অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করেন।
মামলার সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) কুব্বাত হোসেন জানান, সর্বশেষ শুনানিতে আদালত ছয়জনকে অব্যাহতি দিয়ে বাকি ছয়জনের বিরুদ্ধে চার্জ গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন।
এদিকে, অব্যাহতি পাওয়া আসামিদের আইনজীবী এম এ সামাদ দাবি করেছেন, এটি একটি হয়রানিমূলক মামলা। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সরঞ্জাম সরবরাহ করা হলেও অর্থ আত্মসাতের কোনো ঘটনা ঘটেনি, বরং অস্বাভাবিক মূল্য দেখিয়ে বিল স্থগিত রাখা হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে একটি আইসিইউ ইউনিটের পর্দার দাম ৩৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা নির্ধারণ নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। এরপর থেকেই ঘটনাটি ‘ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পর্দা কেলেঙ্কারি’ নামে পরিচিতি পায় এবং জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
বর্তমানে মামলার পরবর্তী বিচারিক কার্যক্রমের দিকে নজর রয়েছে সংশ্লিষ্টদের।