বুধবার , ১লা জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ১৭ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ - বর্ষাকাল || ১৬ই মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

নির্বাচন সংস্কার বাস্তবায়ন না হওয়ায় অবাধ ও সুষ্ঠু ভোট নিয়ে গভীর সংশয় : সুজন সম্পাদক

প্রকাশিত হয়েছে- রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

নির্বাচন সংস্কার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রস্তাব ও সুপারিশ আসলেও সেগুলোর বড় অংশ বাস্তবে কার্যকর হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। তার মতে, এ বাস্তবতায় আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন কতটা অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে—তা নিয়ে গুরুতর সংশয় থেকেই যায়।

রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর একটি হোটেলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত
‘অঙ্গীকার থেকে বাস্তবায়ন : রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা – বাংলাদেশের নির্বাচন ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তিনি।

বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি জনআস্থা আরও দুর্বল হয়েছে। ধারাবাহিকভাবে দেখা গেছে, কোনো রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর সম্পদ ও প্রভাব অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। ক্ষমতা ও সম্পদের এই পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক রাজনীতি দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি করেছে, যা গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতাকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

তিনি আরও বলেন, ভোট কেনাবেচা, চাপ প্রয়োগ ও কারচুপির মতো নির্বাচনী অনিয়ম এখনো একটি বড় সমস্যা। একই সঙ্গে নির্বাচন ব্যবস্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা এবং নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন রয়ে গেছে। তদারকি ও প্রয়োগে ঘাটতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার অভাব নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে ব্যাপক সন্দেহ তৈরি করেছে।

তবে এসব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও জনগণের মধ্যে একটি অবাধ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের আকাঙ্ক্ষা এখনো স্পষ্টভাবে বিদ্যমান বলে উল্লেখ করেন তিনি। তার ভাষায়, নির্বাচনী অখণ্ডতা রক্ষা শুধু জনআস্থা ফেরানোর জন্য নয়, বরং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণকে অর্থবহ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে অপরিহার্য। এ জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং আইনের বাস্তব প্রয়োগে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, বিচার, সংস্কার ও নির্বাচন—এই তিনটি ছিল সরকারের মূল অগ্রাধিকার, এর সঙ্গে নিরাপত্তা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ চতুর্থ বিষয়। তার মতে, সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে মানুষের প্রত্যাশায়। দীর্ঘদিন অবহেলিত জনগোষ্ঠী এখন দৃশ্যমান হয়েছে, প্রকাশ্যে কথা বলছে এবং গণপরিসরে অংশ নিচ্ছে। এই পরিবর্তনের কৃতিত্ব সাধারণ মানুষ, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের।

ড. দেবপ্রিয় বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রগতিশীল ইশতেহার দিতে পারত। তবে জবাবদিহিতা না থাকলে ইশতেহারের কোনো কার্যকর মূল্য থাকে না। তিনি সতর্ক করে বলেন, নির্বাচনের আগে ও পরে সংখ্যালঘু ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া দুর্বলই থেকে যাবে।

তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার যদি তাদের দায়িত্বের শেষ পর্যায়ে একটি সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করতে পারে, তাহলে সেটি ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তবে বাস্তবতা হলো—সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সংসদীয় প্রতিনিধিত্ব ক্রমাগত কমেছে এবং বিদ্যমান প্রতিনিধিরাও অনেক সময় তাদের সমস্যাগুলো কার্যকরভাবে তুলে ধরতে পারেননি।

ড. দেবপ্রিয় জোর দিয়ে বলেন, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সমস্যা জাতীয় সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এগুলোকে খাটো করে দেখা বা রাজনৈতিক সুবিধার জন্য বিভ্রান্তিকরভাবে উপস্থাপন করা হলে ভবিষ্যতে দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন ড. সেলিম জাহান। তিনি বলেন, সংবিধানে সব নাগরিকের সমান অধিকার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের অঙ্গীকার থাকলেও বাস্তবে বারবার তার ব্যত্যয় ঘটেছে। সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হয়েছে, যার ফলে বঞ্চনা ও বাদ পড়ার একটি কাঠামোগত ধারা তৈরি হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আইনের শাসন কার্যকর থাকলে অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে ‘মব’ বা জনতার চাপে আইন প্রয়োগ দুর্বল হয়ে পড়ছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন—দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫১ শতাংশ নারী হলেও আসন্ন নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলো কতজন নারী প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে?

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সিজিএসের সভাপতি জিল্লুর রহমান