দেশে ভবন নির্মাণ খাতে শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘বাংলাদেশ বিল্ডিং রেগুলেটরি কর্তৃপক্ষ’ গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে ‘বাংলাদেশ বিল্ডিং রেগুলেটরি কর্তৃপক্ষ অধ্যাদেশ, ২০২৬’ জারি করা হয়েছে। ভবন নকশা অনুমোদন, নির্মাণমান তদারকি ও বিল্ডিং কোড বাস্তবায়নে এই সংস্থাটি একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ হিসেবে কাজ করবে।
বুধবার রাতে আইন মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ থেকে অধ্যাদেশটি জারি করা হয়।
অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, নতুন এই কর্তৃপক্ষ ভবন নির্মাণ খাতে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্বল তদারকি ও সমন্বয়হীনতা দূর করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সরকারের আশা, এর মাধ্যমে নিরাপদ, টেকসই ও মানসম্মত ভবন নির্মাণের জন্য একটি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে উঠবে।
ভবন নকশা ও নির্মাণে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক ভূমিকা
বাংলাদেশ বিল্ডিং রেগুলেটরি কর্তৃপক্ষের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হবে ভবন নকশা প্রণয়ন ও নির্মাণ কার্যক্রমে কার্যকর নিয়ন্ত্রক কাঠামো তৈরি করা। নির্মাণ পরিকল্পনা, নকশা ও বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত পুরকৌশলী, স্থপতি ও অন্যান্য পেশাজীবীদের পরীক্ষার মাধ্যমে লাইসেন্স প্রদান, তালিকাভুক্তকরণ, এবং প্রয়োজনে লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল করার ক্ষমতা থাকবে এ সংস্থার হাতে।
একই সঙ্গে আধুনিক নির্মাণ সামগ্রী ও প্রযুক্তির আলোকে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড হালনাগাদ, কোড প্রয়োগে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা প্রদান এবং নির্মাণ অনুমোদন প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ করতে প্রযুক্তিনির্ভর অনলাইন প্ল্যাটফর্ম চালুর ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে অধ্যাদেশে।
তদারকি, সুপারিশ ও নীতিগত ভূমিকা
অধ্যাদেশ অনুযায়ী, ভবন নির্মাণে কোড ও নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ও পেশাজীবীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা ও অন্যান্য সংস্থাকে সুপারিশ করতে পারবে এই কর্তৃপক্ষ।
এছাড়া ভবন নির্মাণসংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়ন, বিভিন্ন সরকারি বিধি ও নীতির মধ্যে সমন্বয় সাধন, এবং প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়াতে সরকারকে পরামর্শ দেওয়ার দায়িত্বও থাকবে কর্তৃপক্ষের ওপর।
উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, বিসি (বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন) কমিটি, সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভার বিল্ডিং অফিসিয়ালদের কার্যক্রমের অধিক্ষেত্র নির্ধারণেও কর্তৃপক্ষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে অধ্যাদেশে উল্লেখ করা হয়েছে।
পাঁচ সদস্যের বোর্ডে চলবে কর্তৃপক্ষ
অধ্যাদেশ অনুযায়ী, বিল্ডিং রেগুলেটরি কর্তৃপক্ষ পরিচালনার জন্য পাঁচ সদস্যের একটি পরিচালনা বোর্ড গঠন করা হবে। সরকার একজন চেয়ারম্যানসহ বোর্ডের সদস্যদের নিয়োগ দেবে।
বোর্ডে অন্তর্ভুক্ত থাকবেন—
-
একজন পুরকৌশলী
-
একজন স্থপতি
-
একজন নগর ও আঞ্চলিক পরিকল্পনাবিদ
-
একজন বিচারক বা আইনজ্ঞ
-
একজন অভিজ্ঞ সিভিল সার্ভিস কর্মকর্তা
চেয়ারম্যানই হবেন কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী। চেয়ারম্যান ও সদস্যদের মেয়াদ হবে তিন বছর এবং কোনো ব্যক্তি টানা দুই মেয়াদের বেশি দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না।
তহবিল গঠন ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা
কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি স্বতন্ত্র তহবিল গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। সরকারি অনুদান, দেশি-বিদেশি দাতা সংস্থার অনুদান, বিভিন্ন ফি ও চার্জসহ নানা উৎস থেকে এ তহবিলে অর্থ জমা হবে। তহবিলের অর্থ সরকারের প্রচলিত নিয়মনীতি অনুসরণ করে ব্যয় করা হবে এবং উদ্বৃত্ত অর্থ ভবিষ্যৎ কার্যক্রমের জন্য সংরক্ষণ করা যাবে।
অধ্যাদেশের আওতায় দেশের উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, বিসি কমিটি, সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভার ভবন নকশা অনুমোদন ও কোড প্রতিপালন কার্যক্রমের ওপর নিয়ন্ত্রক ও তদারকি সংস্থা হিসেবে কাজ করবে বাংলাদেশ বিল্ডিং রেগুলেটরি কর্তৃপক্ষ। প্রয়োজনে নোটিশ দিয়ে নকশা ও নির্মাণসংক্রান্ত তথ্য ও নথিপত্র যাচাই করার ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে সংস্থাটিকে।