আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে। ইশতেহারের নাম দেওয়া হয়েছে ‘জনপ্রত্যাশার ইশতেহার’।
বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর পুরানা পল্টনের আইএবি মিলনায়তনে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ইশতেহার ঘোষণা করেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির ও চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম।
ইশতেহার ঘোষণাকালে তিনি বলেন, মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে জনপ্রত্যাশার উন্মেষ ঘটেছে, তা রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রতিফলিত করার অঙ্গীকার থেকেই এই ইশতেহারের নামকরণ করা হয়েছে ‘জনপ্রত্যাশার ইশতেহার’।
তিনি বলেন, নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব ও নীতিনির্ধারণ হয়। আর নির্বাচনের আগে ইশতেহারের মাধ্যমে জাতির সামনে একটি দলের নীতি-ভাবনা ও দেশ গঠনের রূপরেখা উপস্থাপিত হয়। সেই লক্ষ্যেই ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ তাদের নীতিগত অবস্থান, সংস্কার পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কর্মসূচি জাতির সামনে তুলে ধরছে।
মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম বলেন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে একটি ছাত্র আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। দুই হাজারের বেশি মানুষের আত্মত্যাগ এবং হাজার হাজার মানুষের আহত ও পঙ্গুত্বের বিনিময়ে স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটে। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অংশগ্রহণকারী, আহত ও আত্মোৎসর্গকারীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও সম্মান জানান তিনি।
তিনি জানান, ইশতেহারটি তিনটি অধ্যায়ে উপস্থাপন করা হয়েছে—রাষ্ট্র গঠনে নীতিগত অবস্থান, রাষ্ট্র সংস্কারে পরিকল্পনা এবং খাতভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা।
ইশতেহারের লিখিত বক্তব্যে ইসলামী আন্দোলনের আমির বলেন, ইসলাম কেবল ধর্মীয় আচার নয়; বরং জীবন পরিচালনার একটি পূর্ণাঙ্গ বিধান। বিশেষ করে রাষ্ট্র পরিচালনা ও শাসনব্যবস্থায় ইসলামের সুস্পষ্ট নীতিমালা রয়েছে, যার আলোকে বহু শতাব্দী ধরে মানবসভ্যতা শান্তি ও সমৃদ্ধির সঙ্গে পরিচালিত হয়েছে। আদালত, ইনসাফ, আইনের শাসন, দায়বদ্ধতা ও সামাজিক নিরাপত্তা—এসব ইসলামের মৌলিক রাষ্ট্রীয় নীতিমালার অংশ, যা ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে বাস্তবায়ন করবে।
তিনি আরও বলেন, ক্ষমতা হস্তান্তরকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে দেশকে বের করে আনা হবে। ভোটাধিকার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ চর্চা নিশ্চিত করা হবে। নির্বাহী আধিপত্য কমাতে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা, ভূমিকা ও জবাবদিহিতা সাংবিধানিকভাবে স্পষ্ট করা হবে। জাতীয় স্বার্থ ও নাগরিক অধিকার রক্ষায় সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করা হবে।
ধর্ম ও জাতিগত বিষয়ে তিনি বলেন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ দেশের সব মানুষকে সমান অধিকার ও মর্যাদাসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করে। ধর্ম বা জাতির ভিত্তিতে কাউকে সংখ্যালঘু বা সংখ্যাগুরু হিসেবে দেখা হবে না। সবার ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংস্কৃতি চর্চার নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় বিশেষ কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হবে। রাজনৈতিক ও সামাজিক সহিংসতা রোধে সহনশীলতা ও পরমতসহিষ্ণুতা প্রতিষ্ঠায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
নারী ও সামাজিক সুরক্ষা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শরীয়াহ অনুযায়ী নারীদের সম্পত্তির উত্তরাধিকার নিশ্চিত করতে আইনগত ও সামাজিক বাস্তবায়ন জোরদার করা হবে। পথশিশু ও বস্তিবাসীদের জন্য সুনির্দিষ্ট সামাজিক সুরক্ষা ও পুনর্বাসন নীতি গ্রহণ করা হবে। গৃহকর্মী, অনানুষ্ঠানিক ও অবৈতনিক পরিচর্যা কাজে নিয়োজিত নারীদের শ্রমের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।
দুর্নীতির বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে ইসলামী আন্দোলনের আমির বলেন, বাংলাদেশের প্রধান সমস্যা হলো দুর্নীতি। নৈতিক, আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক বহুমাত্রিক উদ্যোগের মাধ্যমে দুর্নীতিকে ধীরে ধীরে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা হবে। দুর্নীতিবিরোধী আইনের কার্যকর প্রয়োগ, সরকারি নিয়োগে ঘুষ ও স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা এবং রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
সবশেষে তিনি বলেন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নারীর মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় দায়বদ্ধ। এই ভূখণ্ডের বিশ্বাস, ঐতিহ্য ও সামাজিক বাস্তবতার আলোকে নারীর সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।