ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মহান মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী গণঅভ্যুত্থান এবং ২০২৪ সালের ফ্যাসিবাদবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনসহ দেশের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নেতৃত্ব দিয়েছেন বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দেওয়া এক বাণীতে তিনি বলেন, ১ জুলাই উদযাপিত এই দিবস দেশের উচ্চশিক্ষা, জ্ঞানচর্চা ও গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের জন্য একটি গৌরবের উপলক্ষ। এ সময় তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী, অভিভাবক, সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীসহ বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সবাইকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। পাশাপাশি জাতির সংকটময় প্রতিটি সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। এসব আন্দোলনে বহু সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থী প্রাণ দিয়েছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, দীর্ঘ সংগ্রাম ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার সম্ভব হয়েছে। এখন সেই গণতন্ত্রকে আরও সুসংহত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়াই প্রধান চ্যালেঞ্জ। এ ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মনে করেন, এবারের বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের প্রতিপাদ্য—‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও উচ্চশিক্ষায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’—বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে অত্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বাণীতে প্রধানমন্ত্রী উচ্চশিক্ষাকে যুগোপযোগী করার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন ও দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষা কারিকুলাম আধুনিক করতে হবে। ভবিষ্যতের কর্মবাজারের চাহিদা বিবেচনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার সিকিউরিটি, প্রোগ্রামিং, ডিজিটাল উদ্যোক্তা উন্নয়ন, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, ন্যানোটেকনোলজি এবং ফাইভ-জি প্রযুক্তির মতো বিষয়গুলোকে পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার ওপর তিনি জোর দেন।
তিনি বলেন, শুধু সনদনির্ভর শিক্ষা নয়, বাস্তবমুখী দক্ষতা ও ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জনের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। তাত্ত্বিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রয়োগভিত্তিক শিক্ষা শিক্ষার্থীদের কর্মজীবনে সফল হতে সহায়তা করবে।
বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইন্টার্নশিপ, অ্যাপ্রেন্টিসশিপ এবং ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া অংশীদারত্বকে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পান।
তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে এবং গবেষণার পরিবেশ শক্তিশালী করতে হবে। আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে গবেষণা, উদ্ভাবন ও নতুন জ্ঞান সৃষ্টির বিকল্প নেই।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অসংখ্য অ্যালামনাই দেশে-বিদেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। তাঁদের অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও পৃষ্ঠপোষকতাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবন কার্যক্রমে আরও বেশি সম্পৃক্ত করার সুযোগ রয়েছে। তিনি বিশেষ করে গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীদের সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।
বাণীতে তিনি সংস্কৃতি, খেলাধুলা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডকে শিক্ষাব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন। পাশাপাশি বৈশ্বিক কর্মবাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরি করতে বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি অন্তত একটি বিদেশি ভাষায় দক্ষতা অর্জনের পরামর্শ দেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রযুক্তিগত জ্ঞানের পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং পরিবেশ সংরক্ষণ সম্পর্কেও শিক্ষার্থীদের সচেতন হতে হবে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই উদ্যোক্তা তৈরির পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যাতে তরুণরা চাকরিপ্রার্থী না হয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার ঐতিহ্য, মেধা ও নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা ধরে রেখে দেশের উচ্চশিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বিকাশে ভবিষ্যতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে তিনি ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত সব কর্মসূচির সার্বিক সাফল্য কামনা করেন।