চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকা জঙ্গল সলিমপুর–এ চলমান যৌথবাহিনীর বিশেষ অভিযানে আকাশপথে নজরদারির জন্য হেলিকপ্টার মোতায়েন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, চট্টগ্রামে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে এবারই প্রথমবারের মতো হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সোমবার (৯ মার্চ) সকাল সাড়ে ১০টার পর থেকে হেলিকপ্টারটি এলাকাটির আকাশে টহল দিতে শুরু করে। অভিযানের সময় পাহাড়ি এলাকা থেকে কোনো সন্ত্রাসী যাতে পালিয়ে যেতে না পারে, সে লক্ষ্যেই আকাশপথে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
ভোর ৬টা থেকে শুরু হওয়া এই অভিযানে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও র্যাব–এর প্রায় চার হাজার সদস্য অংশ নিচ্ছেন। অভিযান পরিচালনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারও করা হচ্ছে। আকাশপথে নজরদারির জন্য হেলিকপ্টারের পাশাপাশি ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়া পাহাড়ি ঝোপঝাড় কিংবা মাটির নিচে লুকিয়ে রাখা অস্ত্র ও বিস্ফোরক শনাক্ত করতে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ডগ স্কোয়াড মোতায়েন করা হয়েছে।
চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মোহাম্মাদ নাজির আহমেদ খাঁন জানান, ভোর থেকে অভিযান চলছে এবং ইতোমধ্যে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়া কিছু অবৈধ সামগ্রী উদ্ধার করা হয়েছে। তবে অভিযান শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিস্তারিত তথ্য জানানো হবে না।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে জঙ্গল সলিমপুরকে ‘দেশের ভেতরে আরেক দেশ’ বলা হতো। সেখানে স্থায়ীভাবে আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে এলাকায় পুলিশের ক্যাম্প স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
অভিযানের অংশ হিসেবে ভোর থেকেই পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে যৌথবাহিনী। প্রবেশ ও বের হওয়ার সব পথেই বসানো হয়েছে তল্লাশিচৌকি, যাতে অভিযানের সময় কোনো চিহ্নিত অপরাধী এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যেতে না পারে। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল হওয়ায় বাহিনীর সদস্যরা কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি চালাচ্ছেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রে জানা গেছে, অভিযানে প্রায় ৫৫০ জন সেনাসদস্য, ১ হাজার ৮০০ পুলিশ সদস্য, ৩৩০ জন এপিবিএন, ৪০০ জন র্যাব এবং ১২০ জন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় এটিই সবচেয়ে বড় সমন্বিত অভিযান বলে মনে করা হচ্ছে।
মূলত গত ১৯ জানুয়ারি এই এলাকায় অভিযানের সময় সন্ত্রাসীদের হামলায় র্যাব-৭–এর নায়েব সুবেদার মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হওয়ার পর থেকেই সরকার এখানে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা করে।
ওই ঘটনায় সীতাকুণ্ড থানা–এ একটি মামলা দায়ের করা হয়। মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে **মোহাম্মদ ইয়াসিন**কে। এতে **নুরুল হক ভান্ডারী**সহ ২৯ জনের নাম উল্লেখ করা হয় এবং অজ্ঞাতনামা আরও প্রায় ২০০ জনকে আসামি করা হয়।
জঙ্গল সলিমপুর প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত একটি পাহাড়ি এলাকা, যা বায়েজিদ বোস্তামী এলাকা–এর পশ্চিমে অবস্থিত। দীর্ঘদিন ধরে পাহাড় কেটে সেখানে হাজারো অবৈধ বসতি গড়ে উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, পাহাড় কেটে প্লট-বাণিজ্য এবং জমি দখলকে কেন্দ্র করে এলাকায় একাধিক সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, এলাকায় প্রধানত দুটি সন্ত্রাসী গ্রুপ সক্রিয়। একটি পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন মোহাম্মদ ইয়াসিন এবং অন্যটির নেতৃত্বে রোকন উদ্দিন। ইয়াসিন আগে স্থানীয়ভাবে ক্ষমতাসীন দলের এক নেতার অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তিনি নিজেকে বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরী–এর অনুসারী বলে দাবি করেন। যদিও র্যাব কর্মকর্তার নিহত হওয়ার ঘটনার পর আসলাম চৌধুরী গণমাধ্যমে জানিয়েছেন, জঙ্গল সলিমপুরে তার কোনো অনুসারী নেই এবং এ ঘটনায় বিএনপির কেউ জড়িত নয়।