চুয়াডাঙ্গা জেলার দর্শনা থানাধীন বেগমপুর ইউনিয়ন পরিষদে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় একটি ভুয়া জন্মনিবন্ধন চক্রের চাঞ্চল্যকর তথ্য উদঘাটন করেছে উপজেলা প্রশাসন। অভিযানে ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও উদ্যোক্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
শনিবার (৯ মে) পরিচালিত অভিযানে গ্রেপ্তার হন ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. রায়হান মাহমুদ (৩৫) এবং উদ্যোক্তা মো. আরিফুল ইসলাম (৩০)। তাদের বিরুদ্ধে সাইবার অপরাধ সংশ্লিষ্ট একাধিক ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম ও প্রতারণার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলার নাগরিকদের নামে ভুয়া ঠিকানায় ডিজিটাল জন্মনিবন্ধন সনদ তৈরি করে আসছিলেন অভিযুক্তরা। অভিযোগ রয়েছে, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও যাচাই-বাছাই ছাড়াই মৌলভীবাজার, কুমিল্লা, কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষকে বেগমপুর ইউনিয়নের স্থায়ী বাসিন্দা দেখিয়ে জন্মনিবন্ধন সনদ দেওয়া হতো।
ঘটনার সূত্রপাত হয় গত ৭ মে, যখন এক অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সরকারি মোবাইল নম্বরে এ সংক্রান্ত অভিযোগ করেন। অভিযোগ পাওয়ার পরপরই উপজেলা প্রশাসন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত শুরু করে। তদন্তের একপর্যায়ে বেরিয়ে আসে ভয়ংকর এই জালিয়াতির তথ্য।
সরেজমিন অনুসন্ধানে সহকারী কমিশনার (ভূমি) নিশ্চিত হন, যেসব ব্যক্তির নামে জন্মনিবন্ধন সনদ তৈরি করা হয়েছে তারা কেউই বেগমপুর ইউনিয়নের প্রকৃত বাসিন্দা নন। এমনকি স্থানীয় বাসিন্দারাও তাদের কাউকে চিনতে পারেননি।
তদন্তে আরও জানা যায়, ইউনিয়ন পরিষদের নির্ধারিত নিবন্ধন আইডি ও ডিজিটাল সিস্টেম অপব্যবহার করে উদ্যোক্তা আরিফুল ইসলাম নিজেই জন্মনিবন্ধন কার্যক্রম পরিচালনা করতেন, যা প্রশাসনিক নীতিমালা অনুযায়ী সম্পূর্ণ বেআইনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্তরা দীর্ঘদিন ধরে অসাধু উপায়ে জন্মনিবন্ধন সনদ তৈরির বিষয়টি স্বীকার করেছেন। প্রশাসনের প্রাথমিক ধারণা, এই চক্রের মাধ্যমে বিপুল সংখ্যক ভুয়া জন্মসনদ তৈরি করা হয়েছে, যা শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তা ও ডিজিটাল তথ্য সুরক্ষার জন্যও বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
ঘটনার পর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশে সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. আশরাফুল ইসলাম বাদী হয়ে দর্শনা থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫-এর একাধিক ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
দর্শনা থানা পুলিশের ওসি (তদন্ত) হিমেল রানা জানিয়েছেন, তদন্ত শেষে মামলা রেকর্ড করা হয়েছে এবং গ্রেপ্তার দুই আসামিকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।
এদিকে লুৎফুন নাহার বলেন, এ ঘটনায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জালিয়াতি চক্রের সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত করতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে এবং খুব দ্রুত পুরো নেটওয়ার্ককে আইনের আওতায় আনা হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, জন্মনিবন্ধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় নথিতে জালিয়াতি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হতে পারে। তাই এমন অপরাধ দমনে প্রযুক্তিগত নজরদারি ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।