ইরানকে নতুন হুমকি যুক্তরাষ্ট্রের: চুক্তি ব্যর্থ হলে ফের সামরিক অভিযান, সতর্কবার্তা মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর
ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সমঝোতা ব্যর্থ হলে দেশটিতে পুনরায় সামরিক অভিযান চালানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে বলে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। শনিবার সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ নিরাপত্তা সম্মেলন ‘সাংগ্রি-লা ডায়লগ’-এ বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এ মন্তব্য করেন।
বিশ্ব রাজনীতিতে যখন মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ বাড়ছে, তখন হেগসেথের এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, ওয়াশিংটন এখনও ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একটি বড় হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে এবং প্রয়োজন হলে সামরিক শক্তি প্রয়োগে পিছপা হবে না।
সম্মেলনে বক্তব্যকালে হেগসেথ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বর্তমানে ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং ইরানের সঙ্গে একটি কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি স্বাক্ষরের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এই চুক্তির মূল লক্ষ্য হচ্ছে ইরানকে পরমাণু অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন থেকে বিরত রাখা এবং মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি আলোচনার মাধ্যমে সমাধান সম্ভব না হয় এবং চুক্তি ভেস্তে যায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী দ্রুত অভিযান পরিচালনার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। তাঁর ভাষায়, “প্রয়োজনে আবারও অভিযান শুরু করার মতো সামর্থ্য, সক্ষমতা এবং প্রস্তুতি আমাদের রয়েছে। সম্ভাব্য যেকোনো সামরিক অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় অস্ত্র ও গোলাবারুদের চেয়েও বেশি সম্পদ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মজুত রয়েছে।”
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র একদিকে তার প্রতিরক্ষা শিল্পকে আরও শক্তিশালী করছে, অন্যদিকে বৈশ্বিক সামরিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়নও নিশ্চিত করছে। তিনি দাবি করেন, ভবিষ্যতে যুদ্ধাস্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতা দ্বিগুণ, তিনগুণ এমনকি চারগুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে ওয়াশিংটন।
উল্লেখ্য, ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি সেই উত্তেজনা চরমে পৌঁছালে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে। প্রায় ৪০ দিন ধরে চলা সংঘাতের পর ৭ এপ্রিল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন।
বর্তমানে সেই যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও দুই দেশের মধ্যে স্থায়ী কোনো সমঝোতা চুক্তি এখনও স্বাক্ষরিত হয়নি। যুদ্ধবিরতির অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে পৌঁছানো। তবে প্রায় দুই মাস অতিক্রম হলেও এ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়নি।
এদিকে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের লক্ষ্যে নতুন একটি চুক্তির বিষয়ে উভয় পক্ষের কর্মকর্তারা নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখনও সেই প্রস্তাবে চূড়ান্ত অনুমোদন দেননি।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না হলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে তেলের বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপরও এর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
পিট হেগসেথের সাম্প্রতিক এই বক্তব্যকে অনেকেই ইরানের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবে দেখছেন। তবে এটি একই সঙ্গে ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্র আবারও সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণের পথ খোলা রাখছে।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর ওয়াশিংটন ও তেহরানের চলমান আলোচনার দিকে। কারণ এই আলোচনার ফলাফল শুধু দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কই নির্ধারণ করবে না, বরং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপরও গভীর প্রভাব ফেলবে।