বৃহস্পতিবার , ২রা জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ১৮ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ - বর্ষাকাল || ১৭ই মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

চামড়ার ন্যায্যমূল্য না পেয়ে বিপাকে মাদরাসা-এতিমখানা, রাতভর অপেক্ষার পরও মিলেনি ক্রেতা

প্রকাশিত হয়েছে- শুক্রবার, ২৯ মে, ২০২৬

পবিত্র ঈদুল আজহায় কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ করে প্রতিবছর যেসব মাদরাসা ও এতিমখানা নিজেদের ব্যয় নির্বাহের বড় একটি অংশ জোগাড় করে, এবার তারা পড়েছে চরম হতাশায়। বরিশালসহ বিভিন্ন এলাকায় দিনভর চামড়া সংগ্রহের পর রাতভর অপেক্ষা করেও অনেক প্রতিষ্ঠান ন্যায্যমূল্য তো দূরের কথা, ক্রেতাই খুঁজে পায়নি।

বরিশাল-এর বাবুগঞ্জ উপজেলার রহমতপুর ইউনিয়নের রাজগুরু কেরাতুল কোরআন কওমি মাদরাসার প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুল্লাহ জানান, ঈদের দিন সকাল থেকে শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে চামড়া সংগ্রহ করেন তারা। পার্শ্ববর্তী কয়েকটি মাদরাসার সহযোগিতায় মোট ২২০টি গরুর চামড়া সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু সন্ধ্যার পর থেকেই শুরু হয় ভোগান্তি।

তিনি বলেন,
“কয়েকজন পাইকারকে ফোন করেছি, অনুরোধ করেছি—কেউ চামড়া নিতে আসেনি। পরে রহমতপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় সারারাত চামড়া নিয়ে অপেক্ষা করেছি। শেষ পর্যন্ত সকালে বাধ্য হয়ে কম দামে ট্যানারি মালিকের কাছে দিতে হয়েছে।”

তার দাবি, ২২০টি চামড়ার জন্য মাত্র ১৫ হাজার টাকা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিটি চামড়ার দাম পড়েছে প্রায় ৬৮ থেকে ৭০ টাকা। এতে পরিবহন ও শ্রমিক খরচও উঠছে না।

শুধু বাবুগঞ্জ নয়, উজিরপুর, মুলাদী, হিজলাসহ বরিশালের বিভিন্ন উপজেলায় মাদরাসা ও এতিমখানা কর্তৃপক্ষ একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। অনেকেই বলছেন, চামড়া সংগ্রহ, লবণ দেওয়া, সংরক্ষণ ও পরিবহনে যে খরচ হয়েছে, বিক্রির টাকায় সেটিও মেটানো সম্ভব হচ্ছে না।

সরেজমিনে দেখা গেছে, সরকারি নির্ধারিত দামের সঙ্গে বাস্তব বাজারের বড় ধরনের ফারাক রয়েছে। কোথাও চামড়া বিনামূল্যে সংগ্রহ করা হয়েছে, আবার কোথাও নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন সংগ্রাহকরা।

চামড়া বিক্রেতাদের অভিযোগ, বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে একটি অসাধু সিন্ডিকেট। তাদের নির্ধারণ করা দামের বাইরে চামড়া বিক্রির সুযোগ নেই। ফলে সাধারণ কোরবানিদাতা, মৌসুমি ব্যবসায়ী এবং মাদরাসা-এতিমখানাগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছে।

এক স্থানীয় বিক্রেতা বলেন,
“সরকার যে দাম নির্ধারণ করেছে, বাস্তবে তার অর্ধেকও পাওয়া যাচ্ছে না। বাজারে কার্যকর নজরদারি না থাকায় কিছু ব্যবসায়ী সুযোগ নিচ্ছে।”

বরিশাল নগরীর কীর্তনখোলা তীরবর্তী ফলপট্টি ও পোর্ট রোড এলাকাতেও ঈদের দিন মাদরাসার শিক্ষক ও প্রতিনিধিদের চামড়া নিয়ে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। নগরের জামিয়াতুল মাদরাসা-র শিক্ষক মিজানুর রহমান জানান, তিনি ৪২টি বড় গরুর চামড়া ৪৫০ টাকা করে বিক্রি করেছেন। পরে আরও কিছু চামড়া নিয়ে গেলে পাইকাররা আগের চেয়েও কম দাম প্রস্তাব করেন।

অন্যদিকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা বাজার পরিস্থিতির জন্য ট্যানারি মালিকদের দায়ী করছেন। তাদের দাবি, ঢাকার ট্যানারিগুলোর কাছে আগের বছরের বিপুল পরিমাণ পাওনা বকেয়া রয়েছে। একই সঙ্গে লবণ, সংরক্ষণ ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় তারা বেশি দামে চামড়া কিনতে পারছেন না।

বর্তমানে বড় গরুর চামড়া ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা, মাঝারি চামড়া প্রায় ৩০০ টাকা এবং ছোট চামড়া ২০০ টাকার মধ্যে কেনাবেচা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, চলতি বছর বরিশাল বিভাগে প্রায় ৫০ হাজার চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। তবে সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সীমাবদ্ধতার কারণে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ চামড়া নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ বিষয়ে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন,
“চামড়ার মূল্য নির্ধারণ ও বাজার ব্যবস্থাপনার বিষয়টি মূলত বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন।”

খাতসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এভাবে লোকসান চলতে থাকলে আগামী বছর অনেক মাদরাসা ও এতিমখানা আর চামড়া সংগ্রহে আগ্রহী হবে না।