বৃহস্পতিবার , ২রা জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ১৮ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ - বর্ষাকাল || ১৭ই মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

চট্টগ্রাম ওয়াসায় ৮০ কোটি টাকার পানি উধাও কান্ড, কতৃপক্ষের নেই কোন পদক্ষেপ

প্রকাশিত হয়েছে- সোমবার, ২৬ জানুয়ারি, ২০২৬

চট্টগ্রাম ওয়াসায় উধাও ৮০ কোটি টাকার পানি
কাগজে-কলমে উৎপাদন ও বিতরণের হিসাবে কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু দিনের শেষে রাজস্ব আদায়ের খাতায় মিলছে না বড় একটি অংশ। চট্টগ্রাম ওয়াসায় গত এক অর্থবছরেই প্রায় ৮০ কোটি টাকার পানি খোলাখুলিভাবে ‘নাই’ হয়ে গেছে। বিপুল পরিমাণ এই পানির হদিস নেই খোদ ওয়াসা কর্তৃপক্ষের কাছেও। অদ্ভুত এক নীরবতায় এই বিশাল আর্থিক ক্ষতিকে স্রেফ ‘সিস্টেম লস’ হিসেবে চালিয়ে দিচ্ছে সংস্থাটি।

কাগজে-কলমে উৎপাদন ও বিতরণে কোনো ঘাটতি নেই। খরচও দেখানো হচ্ছে নিয়মমাফিক। কিন্তু রাজস্বের খাতায় মিলছে না বিপুল অঙ্কের হিসাব। সবকিছু ‘ঠিকঠাক’ থাকার পরও চট্টগ্রাম ওয়াসায় গত অর্থবছরে প্রায় ৮০ কোটি টাকার পানি উধাও হয়ে গেছে। কোথায় গেল সেই পানি, কারা ব্যবহার করল—এর স্পষ্ট জবাব নেই কর্তৃপক্ষের কাছে। অদ্ভুত এক নীরবতায় চুরির এই বড় অঙ্কের ঘটনাকে ওয়াসা স্রেফ ‘সিস্টেম লস’ হিসেবে চালিয়ে দিচ্ছে কতৃপক্ষ।

এর মধ্যেই চলতি অর্থবছরের ছয় মাসে আরও ৪০ কোটি টাকার পানি চুরি হওয়ার তথ্য মিলে অনুসন্ধানে। তবুও পরিস্থিতিকে যেন ‘স্বাভাবিক’ হিসেবেই ধরে নিচ্ছে সংস্থাটি। এমনকি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য আগেভাগেই ২০ শতাংশ ‘সিস্টেম লস’ ধরে বাজেট পরিকল্পনা করা হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য ৭২ কোটির বেশি।

ওয়াসা কর্তৃপক্ষ বরাবরের মতোই দায় দিচ্ছে মিটার রিডার সংকট ও কিছু অসাধু কর্মচারীর ওপর। কিন্তু বছর ঘুরে একই ব্যাখ্যার মধ্যেই থেকে যাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারানোর বাস্তবতা।

চট্টগ্রাম পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষের আয়-ব্যয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চট্টগ্রাম ওয়াসায় মোট পানি উৎপাদন হয়েছে ১৭ হাজার ১৯৬ কোটি লিটার। কাগজ অনুসারে এই পুরো পরিমাণ পানিই ‘সরবরাহ’ করা হয়েছে। তবে বিক্রির তালিকায় দেখা যাচ্ছে মাত্র ১২ হাজার ৭১৫ কোটি লিটার। অর্থাৎ উৎপাদিত পানির ২৬ শতাংশই রাজস্বের আওতাভুক্ত করা সম্ভব হয়নি। এই ২৬ শতাংশ পানির পরিমাণ ৪ হাজার ৪৭০ কোটি ৯৬ লাখ লিটার। প্রতি হাজার লিটার পানির উৎপাদন খরচ ১৮ টাকা হিসেবে এই হারানো পানির আর্থিক মূল্য দাঁড়িয়েছে ৮০ কোটি ৪৮ লাখ টাকা।

অন্যদিকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে উৎপাদন হয়েছে ৯ হাজার ১৩১ কোটি লিটার পানি। বিতরণও একই। বিক্রি হয়েছে ৬ হাজার ৮৯১ কোটি লিটার। হিসাব অনুযায়ী রাজস্ব বহির্ভূত পানি ২৫ শতাংশ, যার পরিমাণ ২ হাজার ২৮২ কোটি ৭৫ লাখ লিটার। উৎপাদন খরচ অনুযায়ী এর দাম দাঁড়ায় ৪০ কোটি ২৩ লাখ টাকা।

এবং চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেও এই প্রবণতা কমেনি। এই সময়ে ৯ হাজার ১৩১ কোটি লিটার পানি উৎপাদন ও বিতরণ করা হলেও বিক্রি হয়েছে মাত্র ৬ হাজার ৮৯১ কোটি লিটার। ফলে রাজস্বহীন পানির হার দাঁড়িয়েছে ২৫ শতাংশ, যার বাজারমূল্য ৪০ কোটি ২৩ লাখ টাকা। বছরের পর বছর এই চুরি বা অপচয়কে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণ ও স্বাভাবিক হিসেবেই মেনে নিয়েছেন ওয়াসার কর্মকর্তারা।

চট্টগ্রাম ওয়াসায় কোটি কোটি টাকার পানি চুরির বিষয়টি বছরের পর বছর ‘সিস্টেম লস’ হিসেবেই দেখানো হচ্ছে। এতে সরকারের বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে। এই ধারা বজায় রেখেই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য আগাম পরিকল্পনায় সিস্টেম লস ধরে রাখা হয়েছে।

ওই অর্থবছরে উৎপাদনের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ২০ হাজার ৭৫ কোটি লিটার পানি। বিতরণও হবে সমপরিমাণ। বিক্রির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১৬ হাজার ৬০ কোটি লিটার। সে হিসাবে ২০ শতাংশ পানি সিস্টেম লস হিসেবে ধরা হয়েছে, যার পরিমাণ ৪ হাজার ১৫ কোটি লিটার। টাকার অঙ্কে এর মূল্য দাঁড়ায় ৭২ কোটি ২৭ লাখ।

এই বিশাল চুরির কারণ হিসেবে পুরনো যুক্তিই নতুন করে তুলে ধরছেন দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা রুমন দে এর সাথে এবিষয়ে জানতে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও কোন সাড়া পাওয়া যায়নি পরে তার হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা পাটিয়ে জানতে চাওয়া হয় এসব অভিযোগের বিষয়ে।

তবে ওয়াসা সূত্রে বর্তমানে ওয়াসার ৮৬ হাজার ৩০৯টি সংযোগ রয়েছে। এর মধ্যে আবাসিক সংযোগ ৭৮ হাজার ৫৪২টি এবং বাণিজ্যিক ৭ হাজার ৭৬৭টি। নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডে এত বিপুল সংখ্যক গ্রাহকের মিটার রিডিং দেখা ও বিল পৌঁছানোর জন্য মিটার রিডার আছেন মাত্র ৩৭ জন। অথচ সেখানে অন্তত ৯০ জন লোকবল প্রয়োজন। অর্থাৎ আরও ৫৩ জন লোকবলের ঘাটতি রয়েছে।

এবিষয়ে উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক শারমিন আলমের কাছে জানতে চেয়ে বার্তা পাটানো হলেও কোন সাড়া মিলেনি।

তবে চট্টগ্রাম ওয়াসার রাজস্ব সূত্রে জানা যায়, বাড়ি বাড়ি গিয়ে মিটার রিডিং দেখে বিল করতে না পারায় এই ঘাটতি কমছে না।

মাঠ পর্যায়ে অভিযোগ রয়েছে যে, অসাধু কিছু কর্মকর্তা ও কর্মচারী মিলে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। এই চক্রটি বিভিন্ন এলাকায় কৌশলে ওয়াসার পানি চুরি করে বিক্রি করে দিচ্ছে। এই অনিয়ম ও চুরি ঠেকাতে চট্টগ্রাম নগরীতে ৩ হাজার স্মার্ট মিটার স্থাপন করেছিল ওয়াসা। তবে বিপুল এই বিনিয়োগের সুফল এখনো মেলেনি। সুফল না মিললেও সমাধান হিসেবে আরও এক লাখ স্মার্ট মিটার স্থাপনের নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। প্রতি মাসে ৮ থেকে ১০টি অভিযানে অবৈধ সংযোগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও তা বিশাল এই চুরির তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল বলে স্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্টরা।