পটুয়াখালীর দক্ষিণাঞ্চলে বঙ্গোপসাগরের মোহনায় জেগে ওঠা জনপদে বসবাসকারী মান্তা সম্প্রদায়ের মানুষের জীবন যেন প্রকৃতির সঙ্গে প্রতিদিনের এক কঠিন সংগ্রামের গল্প। নদী আর সমুদ্রকে ঘিরেই তাদের জীবন, আর ছোট ছোট ডিঙ্গি নৌকাই তাদের ঘর, ঠিকানা এবং টিকে থাকার শেষ ভরসা। ঈদুল আজহা সামনে এলেও উৎসবের আনন্দের বদলে তাদের জীবনে জায়গা করে নিয়েছে অনিশ্চয়তা, অভাব আর বেঁচে থাকার লড়াই।
চরমোন্তাজ দ্বীপে বসবাসকারী মান্তা সম্প্রদায়ের বেশিরভাগ মানুষ মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করেন। মাছ ধরতে পারলে পরিবারের চুলায় আগুন জ্বলে, আর মাছ না মিললে অনাহার যেন তাদের নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়ায়। ফলে ঈদ তাদের কাছে আনন্দের নয়, বরং আরেকটি সাধারণ দিনের মতোই।
সরেজমিনে দেখা যায়, ঈদ উপলক্ষে কোরবানির পশু কেনা বা বিশেষ কোনো প্রস্তুতির চিহ্ন নেই সেখানে। নারী-পুরুষ সবাই জীবিকার সংগ্রামে ব্যস্ত। ছোট্ট ডিঙ্গি নৌকাতেই চলছে সংসারের সব কাজ—সেখানে রান্না হচ্ছে, শিশুরা বেড়ে উঠছে, আর সেখানেই কাটছে পুরো জীবন।
৫৫ বছর বয়সী আসমা বেগম বলেন, “আমরা নদীতে যেতে পারি না, মাছ ধরা বন্ধ। ঘরেও তেমন চাল নেই। ঈদ আসছে, কিন্তু আমাদের কোনো আনন্দ নেই। কোরবানি দেব কোথা থেকে, ভালো খাবারও খেতে পারব কিনা জানি না।”
একই বাস্তবতা তুলে ধরেন মাহিনুর। স্বামী-সন্তান নিয়ে ছোট্ট নৌকাতেই তার সংসার। তিনি বলেন, “নৌকাই আমাদের ঘর-বাড়ি। মাছ ধরেই সংসার চলে। একদিন মাছ না ধরতে পারলে পরের দিন খাবার জোটে না। কোরবানির মাংস কখনও চোখেও দেখি না।”
মান্তা সম্প্রদায়ের সরদার মো. শাহজাহান জানান, এখানকার বেশিরভাগ মানুষের নিজস্ব জমি বা স্থায়ী ঘরবাড়ি নেই। বিভিন্ন এলাকা থেকে ভাসমান জীবন কাটাতে কাটাতে তারা এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছেন।
বর্তমানে চরমোন্তাজ এলাকায় প্রায় ১০০টি মান্তা পরিবার বসবাস করছে। এর মধ্যে প্রায় ৭০টি পরিবার সরকারি আশ্রয়ন প্রকল্পের আওতায় ঘর পেয়েছে। তবে এখনো প্রায় ৩০টি পরিবারের একমাত্র আশ্রয় ছোট ডিঙ্গি নৌকা।
এ বিষয়ে নিরুপম মজুমদার বলেন, সরকারিভাবে তাদের চাল, তেল, ডালসহ বিভিন্ন সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ভিজিএফ ও ভিজিডি কার্যক্রমের আওতায় এনে তাদের জীবনমান উন্নয়নের চেষ্টা চলছে।
ঈদ যখন দেশের অধিকাংশ মানুষের জন্য আনন্দ আর উৎসবের উপলক্ষ, তখন চরমোন্তাজের মান্তা সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় চাওয়া—একবেলা ভালো খাবার আর নিরাপদ একটি আশ্রয়।