নওগাঁর মান্দায় দক্ষিণ শ্রীরামপুর ইসলামিয়া মাদ্রাসার জমি জবর দখল,জমি লীজের টাকা ও অনুদানের অর্থ আত্মসাৎ, পূর্বের রেজুলেশসহ যাবতীয় হিসাব-নিকাশের কাগজপত্র নবগঠিত কমিটিকে বুঝিয়ে না দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় প্রতিকার চেয়ে বিভিন্ন দপ্তরে একাধিক লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন মাদ্রাসার পরিচালনা কমিটির প্রচার সম্পাদক আব্দুল মালেক আকন্দ। বিভিন্ন দপ্তরে একাধিক অভিযোগ দায়ের করার পরেও কোন প্রতিকার না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তিনি।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, মাদ্রাসার পরিচালনা কমিটির প্রচার সম্পাদক আব্দুল মালেক আকন্দ উপজেলার প্রসাদপুর ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গ্রামের মৃত অকিম উদ্দিনের ছেলে। তিনি বিগত ২০২১ সালে দক্ষিণ শ্রীরামপুর ইসলামিয়া মাদ্রাসার সাড়ে তিন বিঘা জমি বছরপ্রতি ৭০ হাজার টাকা চুক্তিতে লীজ গ্রহণ করার পর সে জমিতে জৈব সারের জন্য ধইঞ্চা চাষ করেন। এরই এক পর্যায়ে সে জমিতে রোপা ধান রোপন করার পূর্বে হালচাষ করাবস্থায় লীজের টাকা পরিশোধ করতে না পারায় তার কাছ থেকে লীজের চুক্তিনামার কাগজপত্রগুলো হাতিয়ে নেয় সাবেক সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব জাহাঙ্গীর আলম ।
পরবর্তীতে লীজ গ্রহিতা আব্দুল মালেককে হালচাষ ও শ্রমিকের মুজুরী বাবদ ১৫ হাজার টাকা দিতে চেয়ে অঙ্গীকার করেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত লীজ গ্রহিতা আব্দুল মালেককে কোন টাকা না দিয়েই জমিটি ইটভাটা মালিক মিলনকে লীজ প্রদান করেন মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ। গোবিন্দপুর মৌজার হাল ৪০১ নং খতিয়ানে আয়জান বেওয়া ও রহিমন বেওয়ার নিজ অংশ গত ১৯৭৮ সালে ১২৬২৬ ও ১৬২৫ নং দানপত্র দলিলমূলে জমিটি মাদ্রসা কর্তৃপক্ষ বরাবর হস্তন্তর করেন। সে সময় থেকে অদ্যবধি প্রায় ৪৫ বছর যাবৎ মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ জমিটি ভোগদখল করে আসছিল।
কিন্তু সু-কৌশলে মিলন জমিটি লীজ নেওয়ার পর আয়জান বেওয়ার ওয়ারিশদের কাছে থেকে কিনে রেখেছেন বলে দাবি করেন। এরপর ২০২৩ সালে বেশকিছু তথ্য গোপন করে জমিটি তার নামে নামজারি করার পর গোবিন্দপুর গ্রামের মৃত মমতাজ মন্ডলের ছেলে তোতা নামে এক আমেরিকা প্রবাসীর নিকট মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে জমিটি বিক্রয় করে দেন। এরপর তোতার লোকজন গত ২০২৪ সালের ১৫ মে মাদ্রাসার নামীয় জমিটির ধান কর্তন করে জোরপূর্বকভাবে দখল করতে এলে নওগাঁ সদর থানার হাঁসাইগাড়ি ইউনিয়নের ভুতুলিয়া গ্রামের নুরুল ইসলামের ছেলে আলতাফ হোসেন, মান্দা উপজেলার প্রসাদপুর ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গ্রামের আলাউদ্দিনের ছেলে জাহাঙ্গীর আলম, মৃত মনসুর আলীর ছেলে আনিছুর রহমান, মৃত রিয়াজুদ্দিনের ছেলে সাইফুল ইসলাম, মৃত মনসুর আলীর ছেলে পিয়ার,মৃত পিয়ারের ছেলে মিলন এবং মৃত বানু সাখিদারের ছেলে আজিজারের বিরুদ্ধে নওগাঁ আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন মাদ্রাসার পরিচালনা কমিটির প্রচার সম্পাদক আব্দুল মালেক আকন্দ।
পরবর্তীতে ওই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা একটি মনগড়া প্রতিবেদন করায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ। এমতাবস্থায় পূর্বের কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নব গঠিত কমিটির সাধারণ সম্পাদক গত ৫ মে উপজেলার মান্দা সদর ইউনিয়নের কয়াপাড়া গ্রামের ইটভাটা ব্যাবসায়ী নাজমুল হক মিলনের খারিজ কেস বাতিলের জন্য সহকারী কমিশনার (ভূমি) মান্দা বরাবর একটি লিখিত আবেদন করেন। তার আবেদনের প্রেক্ষিতে তদন্ত প্রতিবেদন প্রদানের জন্য ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তাকে নির্দেশনা প্রদান করেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) শারমিন জানান লুনা। ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা কর্তৃক তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের পর বাদ-বিবাদী উভয়কে শুনানীর জন্য ডাকা হয়। কিন্তু বিবাদী অনুপস্থিত থাকায় একতরফা রায় প্রদানসহ পূনরায় তদন্ত প্রতিবেদন প্রদানের জন্য নির্দেশ প্রদান করেন কর্তৃপক্ষ।
এরপর পূনরায় গত ২২ জুলাই মান্দা থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন আব্দুল মালেক। অপরদিকে গত ২০ আগষ্ট রবিউল আলম সুজা মান্দার অস্থায়ী সেনা ক্যাম্পে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
এব্যাপারে মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আব্দুল মালেকের দায়েরকৃত অভিযোগটি সঠিক নয়। তার কাছ থেকে লীজের কাগজপত্র বুঝিয়ে নেওয়ার সময় মাদ্রাসার পক্ষ থেকে ডেমারেজ বাবদ ১০ হাজার টাকা দেয়া হয় তাকে। আর মিলন জমিটি আয়জান বেওয়ার ওয়ারিশদের কাছ থেকে কেনার পর তোতা নামের একজনের কাছে বিক্রি করে দেন। তবে, মিলনকে লীজ দেওয়ার বিষয়টি সঠিক নয় বলেও দাবি করেন তিনি।
এ বিষয়ে জানার জন্য ইটভাটা ব্যাবসায়ী নাজমুল হক মিলনের মোবাইলে একাধিকবার ফোন দিয়ে তার মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়ায় তার কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি। আলতাফ হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান,উল্লেখিত দাগে মাদ্রাসার জমি আছে কিনা আমাদের জানা নেই, মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ যদি কাগজপত্র দেখাতে পারে তাহলে আমরা জমি ছেড়ে দেবো।
মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক রবিউল ইসলাম সুজা ও প্রচার সম্পাদক আব্দুল মালেক আকন্দ জানান, আয়জান বেওয়া ও রহিমন বেওয়ার মাদ্রাসার নামে জমিগুলো দান করেন। এরপর থেকে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ উক্ত জমিগুলো ভোগ দখল করে আসছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই অভিযুক্তরা জমিগুলো জবরদখল করায় প্রতিকার চেয়ে বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দায়ের করেছেন।
মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সভাপতি রাশেদ ইকবাল বলেন,বিগত সময়ের উপদেষ্টা আকবর এসব বিষয়ে বিস্তারিত বলতে পারবেন। উনিই মাদ্রাসার জমিগুলো মিলনকে লীজ প্রদান করেন। পরবর্তীতে উনি জমিগুলো তোতা নামের একজনের কাছে হস্তান্তর করায় জমিগুলো নিয়ে আদালতে মামলা চলমান রয়েছে।
এব্যাপারে মান্দা থানার ওসি- তদন্ত আব্দুল গণি বলেন, বিষয়টি অবগত নয়। তবে,অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।