প্রাথমিক শিক্ষায় উদ্ভাবনী শিক্ষকের ভূমিকা

post top

মোঃ মাজহারুল ইসলাম:  নাগরিক সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার জন্য সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে ইনোভেশন একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। প্রাথমিক শিক্ষায় সেবা প্রদান ও গ্রহণকারী উভয়ই আছেন। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও অংশীজন নিয়ে প্রাথমিক শিক্ষার যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে থাকে। মানসন্মত ও গুণগত প্রাথমিক শিক্ষা অর্জনের লক্ষ্যে বিদ্যালয় হতে শুরু করে সর্বোচ্চ পর্যায় তথা প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় পর্যন্ত কতিপয় সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে ইনোভেশন বা উদ্ভাবনী ধারণার প্রয়োগ করা প্রয়োজন। বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষায় মাঠ পর্যায় হতে শুরু করে সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত অসংখ্য ইনোভেশন চর্চা হচ্ছে যা প্রাথমিক শিক্ষায় ঈর্ষণীয় সাফল্য এনে দিয়েছে।

প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য উদ্ভাবনী শিক্ষকের ভূমিকা অপরিসীম। একজন উদ্ভাবনী শিক্ষকই পারে শিশুদের মনে উদ্ভাবনের বীজ বপন করতে। শুধু মাত্র মুখস্ত করে পরীক্ষায় পাস করাকে উদ্দেশ্য না করে অর্জিত জ্ঞানকে কিভাবে বাস্তবে প্রয়োগ করা যায় তা যদি আমরা ছোটবেলা তথা শিক্ষার মূল ভিত্তি প্রাথমিক স্তর থেকেই চর্চা করতে পারি তাহলেই আমাদের শিশুরা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশকে দৃঢ়তার সাথে পরিচালনা করতে সক্ষম হবে। এজন্য পাঠদান পদ্ধতিতে ভিন্নতা আনয়ন সময়ের দাবী। নিয়মিত পড়াশোনার বাহিরে কিছু উদ্ভাবনী বা সৃজনশীল কার্যক্রম গ্রহণ করার মাধ্যমে একজন শিক্ষক পড়াশোনাকে আনন্দঘন ও আকর্ষণীয় করে তুলতে পারেন।

কিছু পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করা যাকঃ

প্রথমত, ক্ষুদে বক্তা তৈরী। সরকারি চাকুরিজীবীসহ অনেকেই সুন্দরভাবে মানুষের সামনে বক্তব্য প্রদান করতে পারেন না। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিভিন্ন প্রকার অনুষ্ঠানে শিশু শিক্ষার্থীদের বক্তব্য প্রদানের সুযোগ দিয়ে তাদেরকে কথা বলার সাহস যুগিয়ে বক্তা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করা।

বাস্তবায়ন কৌশল: প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মা ও অভিভাবক সমাবেশ, বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, ফলাফল ঘোষণার অনুষ্ঠান, শিক্ষক বদলিজনিত ও পঞ্চম শ্রেণির বিদায় অনুষ্ঠানের মত অনুষ্ঠানসমূহে ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের বক্তব্য প্রদানের ব্যবস্থা রাখা। এর ফলে শিশু শিক্ষার্থীদের যে কোন পরিবেশে কথা বলার সাহস ও যোগ্যতা সৃষ্টি হবে, শিশু শিক্ষার্থীদের কথা বলার জড়তা দূর হবে এবং শিশু শিক্ষার্থীরা প্রাথমিক বিদ্যালয় হতেই একজন সুবক্তা হিসেবে গড়ে উঠবে। একজন উদ্ভাবনী শিক্ষকের পক্ষেই এ কার্যক্রম গ্রহণ করা সম্ভব।

দ্বিতীয়ত, প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের পঠন ও লিখন শৈলী অর্জন এবং ইংরেজি ও বাংলা ভাষার শব্দ ভাণ্ডার বৃদ্ধির লক্ষ্যে ওয়ান ডে ওয়ান ওয়ার্ড উদ্ভাবনী ধারণাটি গ্রহণ করা যেতে পারে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা অল্প সময়ের ব্যবধানে সাবলীলভাবে রিডিং পড়ার যোগ্যতা অর্জন করতে সক্ষম হবে এবং তাদের প্রতিদিন একটি করে বাংলা ও ইংরেজি শব্দ শেখানোর ফলে শব্দ ভাণ্ডার সমৃদ্ধ হবে।

তৃতীয়ত, প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ইন্টারনেট ভিত্তিক জানতে চাই কর্নার স্থাপন। প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ল্যাপটপ ও মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর সরবরাহ করা হলেও কোন কোন বিদ্যালয়ে সুষ্ঠু ব্যবহার করা হচ্ছে না। জানতে চাই কর্নার স্থাপনের ফলে একদিকে ল্যাপটপ, মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর ব্যবহার করা হবে। অন্যদিকে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা এই কর্নারের মাধ্যমে তাদের নতুন নতুন অজানা বিষয় সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান অর্জন করতে পারবেন। একজন শিক্ষক এর দায়িত্বে থাকবেন এবং তিনি ইন্টারনেট ব্যবহার করে কিভাবে তথ্য জানতে হয় তা কোমলমতি শিক্ষার্থীদের শেখাবেন।

চতুর্থত, ‘স্টুডেন্ট অব দ্যা ডে’ধারণার সূচনা। উদ্দেশ্য: শিক্ষার্থীদের মাঝে ভাল কাজের প্রতিযোগিতার মনোভাব সৃষ্টি, নেতৃত্বের গুণাবলির বিকাশ ও প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন ঘটানো।

উদ্ভাবনটি বাস্তবায়ন কৌশল: শ্রেণি শিক্ষক প্রতিদিনের সেরা শিক্ষার্থী তথা স্টুডেন্ট অব দ্যা ডে বাছাইয়ের ক্ষেত্রে উল্লিখিত বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করবেন:

১। শিক্ষার্থী স্কুল ড্রেস পড়ে স্কুলে এসেছে।

২। বাড়ির কাজ (হাতের লেখা, ওয়ান ডে ওয়ান ওয়ার্ড ও রিডিং পড়া) সঠিকভাবে করেছে।

৩। ক্লাসে সকল প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিয়েছে।

৪। একটি ভাল কাজ করেছে।

৫। বড়দের সালাম ও ছোটদের স্নেহ করেছে ইত্যাদি।

শ্রেণি ভিত্তিক যে শিক্ষার্থী উপর্যুক্ত বিষয়গুলো সবচেয়ে বেশি ও সুন্দরভাবে বাস্তবায়ন করতে পারবে ঐ শিক্ষার্থী ঐদিনের জন্য স্টুডেন্ট অব দ্যা ডে হবে এবং শ্রেণি শিক্ষক তার নাম রেজিস্ট্রারে লিখে রাখবেন। এইভাবে একটি শ্রেণিতে মাসে সর্বোচ্চ সংখ্যকবার স্টুডেন্ট অব দ্যা ডে হওয়া শিক্ষার্থী হবে স্টুডেন্ট অব দ্যা মান্থ।

মা সমাবেশ বা অন্য কোন অনুষ্ঠানে সর্বোচ্চ সংখ্যকবার স্টুডেন্ট অব দ্যা ডে হওয়া শিক্ষার্থীকে আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কার দিতে হবে।

ইনোভেশনটির প্রত্যাশিত ফলাফল:

১. শিক্ষার্থীদের মাঝে ভাল কাজের প্রতিযোগিতার মনোভাব সৃষ্টি হবে, ২. নেতৃত্বের গুণাবলির বিকাশ ঘটবে ও ৩. প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন হবে।

পঞ্চমত, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাল্টিমিডিয়ার মাধমে শ্রেণি পাঠদান বৃদ্ধিকরণ। উদ্দেশ্য: মাল্টিমিডিয়ায় শ্রেণি পাঠদানের প্রতি অনীহা দূর করা। প্রায় প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সরকারিভাবে ল্যাপটপ ও মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর সরবরাহ করা হলেও তা ব্যবহার করে নিয়মিত শ্রেণি পাঠদান হয় না। প্রতি মাসে ক্লাস্টার ভিত্তিক মাল্টিমিডিয়ায় সর্বোচ্চ সংখ্যক পাঠদানকারী শিক্ষককে বাছাই করে ক্লাস্টার/উপজেলা মাসিক সমন্বয় সভায় পুরস্কার প্রদান করে মাল্টিমিডিয়ায় শ্রেণি পাঠদান বৃদ্ধি করে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন ঘটানো সম্ভব।

একজন প্রাথমিক শিক্ষক যদি উপর্যুক্ত ইনোভেশনগুলোসহ অন্যান্য ইনভেটিভ পদ্ধতির মাধ্যমে পাঠদান করতে সক্ষম হন তাহলে প্রাথমিক শিক্ষার দ্রুত মানোন্নয়ন ঘটবে এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করে সুনাগরিক হিসাবে গড়ে উঠে দেশ ও জাতির কল্যাণে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।

–লেখকঃ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), সাভার, ঢাকা।

print

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

15 − 9 =