গবি শিক্ষার্থী মারুফা ইসলাম সেতুর করোনা কালীন ডায়েরি

post top

প্রতি শতকে একবার করে আসছে এমন মারাত্মক মহামারী। ১৭২০ সালে প্লেগ, ১৮২০ এ কলেরা, ১৯২০ এ ইনফ্লুয়েঞ্জা (স্প্যানিশ ফ্লু), ২০২০ সালে করোনা ভাইরাস। ডিসেম্বরে এর প্রাদুর্ভাব শুরু হয়। তবে সেটা আমাদের অজানা ছিল। এক ফেব্রুয়ারির রাতে, প্রতিদিনের মত নৈশভোজ সেরে বাবা তার শোবার ঘরে রাত ১১টায় মোবাইলে বিবিসি নিউজ শুনছিলেন। বিজ্ঞানীদের এই ভাইরাস সম্পর্কে বলতে শুনে আতঙ্কিত হয়ে সাথে সাথে ড্রইং রুমে এসে আমাদের সবাইকে অবগত করেন। তারপর থেকে টিভিতে প্রতিদিন নিউজ দেখতাম- প্রথমে চীন, তারপর ইতালি, স্পেন তিন দেশে এ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বেড়ে গেল। এতে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা দিন দিন বাড়তেই লাগলো, খবর দেখে ভালো লাগত না, তখন থেকেই মনে ভয়ের সৃষ্টি হয়। ভীষণ সংশয়ে কাটছিল দিনগুলো আমাদের দেশে ঢুকে পড়ে কিনা এ ভাইরাস। এই অদৃশ্য ভাইরাসের ভয়ে ভার্সিটি যেতে বারণ করতো বাবা, মন মানতো না, ভয় উপেক্ষা করে যেতাম। বাবা মাস্ক পরিয়ে দিত, টেনশনে থাকতো সবাই, এই আতঙ্ক নিয়ে প্রতিদিন ভার্সিটি যাওয়া হতো।

৮ই মার্চঃ রবিবার ২০২০
আন্তর্জাতিক নারী দিবস। দেশে প্রথম একজন করোনা রোগী শনাক্ত হলো। সারাদেশে আতঙ্কের ছায়া নেমে গেল। সব চ্যানেলের ঐদিনের ব্রেকিং নিউজ এটা। আরও ভয় বেড়ে গেল। আর বুঝি রক্ষা নেই। দেশের কী হবে, মানুষের কী হবে- চিন্তায় মাথা ঘুরপাক খেতে লাগলো। দিন দিন আক্রান্তের সংখ্যা দেশে-বিদেশে পর্যায়ক্রমে বেড়েই চললো।

১৬ই মার্চঃ সোমবার ২০২০
করোনা আতঙ্কে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের ঘোষণা হলো। ছুটির খবর শুনে প্রথমে খুব খুশিই হয়েছিলাম। ছুটি পেলে ভালো লাগাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু পরক্ষনেই মনটা খারাপ হয়ে গেল। যখন শুনলাম ছুটিটা অনেক দিনের প্রায় ১৭দিন। কারণ এতদিনের ছুটিতে ভার্সিটি, বন্ধু-বান্ধব, স্যার-ম্যামদের অনেক মিস করব। অপরদিকে করোনা নিয়ে মা বাবার টেনশন। বাইরে বেরুলেই ভার্সিটি মুখী হলেই মাস্ক পড়িয়ে দিত আর শুধু বলত “ভার্সিটি কবে বন্ধ দিবে, ভাইরাস ধরলে তো আর রক্ষা নেই।” তাই ক্লাস ছুটির পর বাসায় এসেই মা বাবাকে বন্ধের খবর জানালাম। বন্ধের খবর শুনে তারা নিশ্চিন্ত হলেন।

১৭ই মার্চঃ মঙ্গলবার ২০২০
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী। প্রতিদিনের মত আজও বসলাম টিভি নিউজ দেখার জন্য। টিভি ছাড়তেই মুজিববর্ষের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ‘মুক্তির মহানায়ক’ দেখলাম। প্রায় দুপুর গড়িয়ে এল। লাঞ্চ সেরে বাংলাদেশ পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি জনাব হাবিবুর রহমান স্যারের উপহার দেয়া বইগুলো থেকে একটি বই পড়তে বসলাম। বইটির নাম “ডিটেকটিভ” যেটা উনি আমাকে হলিক্রস কলেজে থাকতে উপহার দিয়েছিলেন। সময়ের অভাবে এতদিন পড়া হয়ে উঠে নি। তাই আজ সেই বইটি পড়া শেষ করলাম।

২৬শে মার্চঃ বৃহস্পতিবার ২০২০
স্বাধীনতা দিবস। লকডাউনের আজ প্রথম দিন। টিভি চ্যানেলের নিউজগুলোতে শুধু করোনারই খবর। সরকার গতকাল ২৬মার্চ থেকে ৪এপ্রিল পর্যন্ত লকডাউন ঘোষণা করলেন। দেশে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। নতুন আক্রান্ত সংখ্যা ৫জন। আর মোট আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৪৪-এ পৌঁছায়। টিভি নিউজ দেখে আতঙ্ক ক্রমশ বেড়েই চলছে। এ দিন আমি প্রাত্যহিক কাজকর্মের ফাঁকে ফাঁকে বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনীমূলক বই “অসমাপ্ত আত্মজীবনী” বইটির কিছু অংশ পড়লাম যেটা সময়ের অভাবে আগে পড়া হয়নি।

৩১শে মার্চঃ মঙ্গলবার ২০২০
লকডাউন এর ষষ্ঠ দিন। জীবন চাকা একইভাবে ঘুরছে। মনে হয় ক্লাচ ব্রেক সব খুলে ফেলা হয়েছে, গাড়ি চলছে ফার্স্ট গিয়ারে। প্রতিদিনের মত লাঞ্চ সেরে টিভির সামনে বসলাম করোনা আপডেট দেখার জন্য। দেখলাম আজ নতুন করে আরও ২জন আক্রান্ত হয়েছে। মোট আক্রান্ত সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫১জনে। ভালো লাগছে না। তাই বোনকে নিয়ে দাবা খেলতে বসলাম। যদিও আমি ওর সাথে কখনও জিততে পারি না; তবুও খেললাম, এবং প্রতিবারের মত হারলাম। এরপর মোবাইল হাতে নিয়ে ফেইসবুকে নিউজ ফিড দেখছিলাম। দেখি বন্ধুরা বিভিন্ন মুখরোচক খাবার রান্না করে ফেইসবুকে পোস্ট করছে। দেশ-বিদেশের বন্ধুদের মুখরোচক খাবার রান্না করে ফেইসবুকে পোস্ট দিতে দেখলেই আমার ক্ষুধা বেড়ে যায়। তাই ইচ্ছে হলো নিজেও কিছু তৈরি করি। এজন্য বিকেলের নাস্তায় ছোটবোনকে সাথে নিয়ে রেসিপি দেখে পাস্তা বানালাম।

৪এপ্রিলঃ শনিবার ২০২০
লকডাউন এর আজ ১০দিন। নিয়ত পরিবর্তনশীল জীবন থমকে আছে আজও। ঘুম আর জাগরণের রুটিন পরিবর্তিত হয়েছে শুধু। সকালের নাস্তা আর খাওয়া হয় না, একেবারে লাঞ্চ করে নেই। সারাদেশে মৃতের সংখ্যা ২জন। আক্রান্ত ৯জন গত ২৪ ঘণ্টায়। মোট আক্রান্ত ৭০জন। সাধারণ ছুটি বাড়ানো হয় ৯এপ্রিল পর্যন্ত। মার্চ এ দেশে করোনা শনাক্ত হওয়ায় এপ্রিল থেকে আমাদের কাজের আন্টিকে ছুটি দিয়ে দিলেন আম্মু। সেই থেকে টুকটাক ঘরের কাজে হাত বাটাই, আম্মুকে সাহায্য করি, ঘরের কাজগুলো সবাই মিলে ভাগ করে নিলাম। আম্মু কাপড় ধোয়া, আব্বু ঘর মুছা এবং আমি আর ছোটবোন মিলে থালাবাসন ধোয়ার কাজ নিলাম। আব্বু বাইরে থেকে এসে ঘর মুছার পাশাপাশি আম্মুকে রান্নায়ও সাহায্য করে। কোনো কিছু আম্মুর মনের মতো না হলেই রাগারাগি শুরু করে। শুরু হয় তাদের মান-অভিমান। এরপর আব্বু আমাদের ইশারা দিয়ে আম্মুকে আরও রাগানোর চেষ্টা করে। এসব দেখে আমি আর ছোটো মজা নেই। ভালোই লাগে। দেশের এমন বিরূপ পরিস্থিতিতেও এসব কিছুক্ষণের জন্য আনন্দ দেয়।

৫এপ্রিল, রবিবার ২০২০
লকডাউন এর ১১দিন। সারাদেশে মৃতের সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে গেছে। ১৮জন গত ২৪ ঘণ্টায়। মোট আক্রান্ত ৮৮ জন। করোনা কুইনের গলার স্বরে কি সামান্য কাঁপন দেখলাম? ভাবলাম হয়ত দেখার ভুল, কিন্তু পরে দেখলাম যে সত্যিই। এভাবে চলতে থাকলে তো ভাইরাস মহামারীতে রূপ নিবে। কিছু ভালো লাগে না, শুধু ভয় আর ভয়। বাবা রোজ বাইরে যায়। ফ্রুটস আর ভেজিটেবলস এর ৩টা আড়ৎ আছে আমাদের। আর সরকারের নির্দেশ আড়ৎ বন্ধ রাখা যাবে না। তাই বাধ্য হয়েই বাবাকে রোজ বাইরে যেতে হয়। এজন্য আমাদের পুরো পরিবারই ঝুঁকিতে। মা পিপিই পড়িয়ে দিতে চাইলে বাবা রাগ করেন। বাবার বেশি গরম লাগে বলে পড়তে চায় না। মাস্ক আর স্যানিটাইজার ইউজ করেই বাইরে যায়। সব মিলিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত ভয়, এক শ্বাসরুদ্ধকর সময় পার হচ্ছে। কোথায় পাবো একটু বিনোদন! মোবাইলটা হাতে নিলাম। ভার্সিটির ফ্রেন্ডদের কথা ভাবতেই মনে হলো একটু গ্রুপে ঢুকি। গ্রুপে ঢুকেই ফ্রেন্ডদের বিভিন্ন ফানি মেসেজ, ফানি ভিডিও দেখেই কিছুক্ষণের জন্য দেশের করুণ অবস্হার কথা ভুলে যাই, অট্টহাসি দেই।
নিউজে দেখলাম বিদেশে যেসব মুখপাত্র করোনা নিয়ে বিবৃতি দিচ্ছেন, তাদের দেখলে মনে হয় যুদ্ধক্ষেত্রে আছেন, কোনরকম শার্ট প্যান্ট পরেছেন, শেভ ও হয়ত করা হয়নি, চুল নেই পরিপাটি। আর আমাদের দেশের কিং কুইনদের দেখলে মনে হয় বিয়ের দাওয়াতে যাওয়ার পথে রাস্তায় থেমে একটু জরুরি কাজ সেরে নিচ্ছে। কয়েকটি ক্লাষটার ভিত্তিক সংক্রমণ হয়েছে, এলাকা গুলো লকডাউন করা হয়েছে। আসলে ভয় আর আতংক দুটি ভিন্ন জিনিস। আতংক মানুষকে স্থবির করে দেয়। কিন্তু ভয়? ভয় পেলেই মানুষ প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করে। আমাদের শরীরও ভয় পায়। শরীর ভয় পেয়ে এন্টিবডি নিঃসরণ ঘটায়। কিন্তু আমাদের জরুরী ব্যবস্হা দেখলে মনে হয় সবাইকে ধমকানো হচ্ছে। বাইরে বেরিয়েছেন কেন? বাসায় যান। আবার পরক্ষণেই বলছেন, আমাদের কিছুই হয়নি, দু চারটা মরছে, সবাই বুড়া, অসুস্থ ছিল এবং আমাদের সব কিছুই আছে, ভয়ের কিছুই নেই। হুমায়ুন আহমেদের একটা বইতে পড়েছিলাম “মিথ্যা বলা খুব কঠিন, একটা মিথ্যাকে দাঁড়া করানোর জন্য কষ্ট করে আরো অনেক মিথ্যা বানাতে হয়। সত্য প্রথমে বলা হয়ত একটু কঠিন, কিন্তু বলা শুরু করলে সহজেই সহজ, শুধু বলে যাওয়া। কি জানি, আমরা কি একটু চেস্টা করে দেখতে পারি? এত নির্ভয় দিলে লোকজন কেন ঘরে থাকবে?

অনেক মানুষ লকডাউনে আছে, অনেক কিশোর তরুণ হয়ত তারুণ্যের উদ্দীপনায় পরিস্থিতি উপলব্ধি করতে পারছেনা। কিন্তু অবাক হই যখন দেখি শিক্ষিত আধুনিক লোকজন লকডাউনের মধ্যে বাইরে বেড়াচ্ছে। কর্পোরেট লেভেলে চাকরি করা এলাকার একজনকে কিছুতেই বুঝাতে পারলাম না যে কেন সুস্হ থাকলেও ঘরে থাকতে হবে। অনেকের অবস্হা দেখে মনে হয় তারা ভাবছে করোনা পাকিস্তানী আর্মির মতো। শুনেছি কোথাও কোথাও আক্রমণ হয়েছে, কিন্তু আমাদের এদিকে তো এখনও আসে নাই। বাইরে গিয়ে উকি ঝুঁকি মেরে দেখছে কোন গোলাগুলির শব্দ পাওয়া যায় কিনা, ট্যাংক আসছে কিনা। প্রস্তুত আছি, ও রকম কিছু হলে সোজা বাংকারে ঢুকব। করোনা শুধু আমাদের না, সমস্ত মানব জাতিকে শেখাবার চেস্টা করছে অনেক কিছু। কেউ শিখছে, আবার আমাদের মত অনেকে পরীক্ষার আগের রাতের অপেক্ষায় আছে, সেদিন রাত জেগে পড়বে।

৭এপ্রিলঃ মঙ্গলবার ২০২০
লকডাউনের আজ ১৩দিন। গত ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছে ৫ জন। মোট মৃত ১৭জন। নতুন আক্রান্ত ৪১ জন। মোট আক্রান্ত সংখ্যা ১৬৪ জন। দুপুরে এই বিবৃতি শুনলাম। খুব খারাপ লাগছিল। তবে ফ্লোরা আপুর ঘোষণা শুনলে মনে হয় না তিনি কোন দুঃখ দুর্দশার কথা বলছেন, মনে হয় বাৎসরিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পুরস্কার ঘোষণা করছেন। আমাদের দেশ জোয়ারের দিক থেকে যেন স্বয়ংসম্পূর্ণ, যখন যে জোয়ার আসে পরিপূর্ণ ভাবেই বিস্তার লাভ করে। যেমন হঠাৎ করে করোনা জোয়ার দেখা দিয়েছে, তার পাশাপাশি প্রতিযোগিতা চলছে চাল চুরির জোয়ারের। সারাদেশে এ পর্যন্ত করোনা রোগী ধরা পড়েছে ১৬৪, চাল চোর ধরা পড়েছে ২০৪ জন। হায়রে করোনা, হায়রে চাল চোর, হায়রে মনুষত্ব! সময়ই বলে দেবে কে ফার্স্ট হবে।

৮এপ্রিলঃ বুধবার ২০২০
লকডাউন এর ১৪ দিন। নতুন আক্রান্ত সংখ্যা ৫৪ জন। মোট আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে ২১৮জনে দাঁড়িয়েছে। নতুন মৃত আরও ৩জন। মৃতের সংখ্যা ২০জন। করোনা নিয়ে শত ঝামেলার মধ্যেও ঝটকা লাগার মত সংবাদ হলো বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার আরেক আসামি গ্রেফতার। আজকে তাকে কোর্টে উঠানো হয়েছে শূন্য ইঞ্চি সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে। আজ সিলেট মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ করোনা আক্রান্ত। হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডের ভেন্টিলেটর অকেজো। বন্দী ঘরে সারাদিন এসব নিউজ দেখেই সময় পার করি। মাঝে মাঝে হোয়াটস অ্যাপ, ম্যাসেন্জার, ফেইসবুকের নিউজ ফিডে ঢুকি। আর ইউটিউবে বিভিন্ন মুভি, মোটিভেশনাল ভিডিও দেখি এবং গান শুনি। এভাবেই দিন কাটতে থাকে।

১৪এপ্রিলঃ মঙ্গলবার ২০২০
লকডাউনের ১৯দিন। ৯এপ্রিল সাধারণ ছুটি বাড়িয়ে ১৪এপ্রিল পর্যন্ত করা হয়েছিল। কিন্তু আজ আবারও ছুটি বাড়িয়ে ২৫এপ্রিল পর্যন্ত করা হয়েছে। আজ পহেলা বৈশাখ, বাংলা পঞ্জিকা বর্ষের প্রথমদিন। আজকের দিনটি বিগত দু তিন সপ্তাহের মতই, তবে গত দু তিন দশকের মত অসুস্থ নয়। করোনার কারণে সমস্ত পৃথিবীতে অসুস্থতা বিরাজ করলেও ঢাকা শহর আজ অনেক সুস্থ ছিল অন্যান্য বছরের তুলনায়। বৈশাখের খর রোদে কিম্ভূতকিমাকার পোশাক পড়া নারী শিশুদের পদচারণা, প্যা পো আওয়াজ, মাইকের শব্দদূষণ এবং ধুলারন্যের হাত থেকে মুক্ত ছিল ঢাকা শহর। সবগুলি টিভি চ্যানেলে বৈশাখী উৎসব পালনের ব্যর্থতার আহাজারি প্রচার করেছে। আজ নতুন আক্রান্ত ২০৯জন। ৭জন মৃত গত ২৪ ঘণ্টায়। মোট মৃতের সংখ্যা ৪৬, মোট আক্রান্ত সংখ্যা ১০১২। মনে শুধু ভয় আর আতংক। প্রতিবারের মত আর বৈশাখ উদযাপন হলো না। বন্দি ঘরেই নববর্ষের স্বাদ নিলাম, সকালে পান্তা-ইলিশ, দুপুরে খিচুড়ি-মাংস। আর ফ্রেন্ডদের কার কেমন উদযাপন হলো তা দেখার, জানার জন্য এফবিতে আসলাম, বুঝলাম যে, সব নববর্ষই শুভ নয়। গতকাল থেকে অনলাইন ক্লাস শুরু হয়ে গেছে। অনেক ফ্রেন্ডরাই গ্রামে চলে যাওয়াতে নেট প্রবলেমের জন্য ঠিকমতো ক্লাস করতে পারেনি। আমার দিক থেকে সেই সমস্যাটা হয়নি, আমি করতে পেরেছি।

১৫এপ্রিলঃ বুধবার ২০২০
লকডাউনের ২০ দিন। আজ বাবা আড়ৎ এর গরিব, অসহায়, দুস্থ কর্মচারীদের খাওয়ানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। কয়েকদিন রান্না করে নিয়ে খাওয়াবেন। তাই মাকে রান্না করে দিতে বললেন। আমি রান্নায় মাকে সাহায্য করলাম। খাবার রান্না করে প্যাক করে দিলাম বাবাকে। লকডাউনের জন্য দোকানপাট, হোটেল সব বন্ধ থাকায় তারা কিছু খেতে পারেন না, তাই বাবা এ সিদ্ধান্ত নেন। এরপর টিভি খুলতেই দেখলাম নতুন আক্রান্ত সংখ্যা ২১৯, নতুন মৃত ৪জন। মোট আক্রান্ত ১২৩১, মোট মৃত ৫০জন। করোনায় আক্রান্ত রোগীদের সরাসরি সেবা দিতে গিয়ে আক্রান্ত হয়ে শাহাদাৎ বরণ করেন বাংলাদেশের প্রথম ডাক্তার সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. মঈন উদ্দিন। খবরটি দেখে খুবই খারাপ লাগলো। এরপর আম্মু বলল, ‘যেহেতু লংটাইম ছুটি, ভার্সিটি কবে খুলবে কিছু ঠিক নেই, এই সুযোগে চলো তোমার নাক ফুড়িয়ে দেই। ঘরেই তো বসে থাকবে, তোমার বান্ধবীরা সবাই ফুঁড়িয়ে ফেলছে, তুমি অনেক বড় হয়ে গেছ, তাও তোমারটা ফোঁড়ানো হয় নাই’। না করাতে রেগে মুখ লাল হলো। কি আর করার, ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও রাজি হলাম, হাতে স্যানিটাইজার, মুখে মাস্ক, অনেক সতর্কতার সহিত আম্মুর সাথে পার্লারে গেলাম, খুব ব্যথা পেলাম।

২১এপ্রিলঃ মঙ্গলবার ২০২০
লকডাউন এর ২৬দিন। করোনায় কতজন মারা গেল, কতজন অসুস্থ হয়েছে তার খবর প্রতিদিন পাচ্ছি পুংখানু পুংখানু রূপে। কতটা পিপিই দেয়া হলো, কতোটা স্টকে আছে, সবকিছুর পরিসংখ্যানই খুব নিখুঁত। গত ২৪ঘণ্টায় করোনায় আক্রান্ত সংখ্যা ৪৩৪ জন এবং মৃত্যু ৯জনের। মোট আক্রান্ত ৩৩৮২জন ও মৃত ১১০জন। প্রতিদিনের মত আজও লাঞ্চ সেরে খবর দেখতে বসলাম। দেখলাম একজন ভিক্ষুকের মহানুভবতা। কর্মহীনদের জন্য ১০ হাজার টাকা দিলেন এই ভিক্ষুক নজিমুদ্দিন। বয়স ৮০ বছর। ভিক্ষা করে সংসার চালান তিনি। বসতঘর মেরামত করার জন্য দুই বছরে ভিক্ষা করে জমিয়েছেন ১০ হাজার টাকা। কিন্তু এ টাকা দিয়ে তার নিজের ঘর মেরামত না করেই দিয়ে দিলেন ঝিনাইগাতীর কর্মহীনদের খাদ্য সহায়তার জন্য খোলা তহবিলে। এমন মহানুভবতা বাস্তবে কোথাও কখনও দেখিনি। মহানুভবতার দারুণ উদাহরণ এটা। এ উদাহরণের মাধ্যমে সমাজে যারা বিত্তশালী আছেন, তাদের প্রতি আহ্বান জানাই, এ দুর্যোগের সময় অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে।

২৫এপ্রিলঃ শনিবার ২০২০
লকডাউনের আজ ৩০ দিন। লকডাউনের মাস পুর্তি। সাধারণ ছুটি বাড়িয়ে ৫মে পর্যন্ত করা হয়েছে। এভাবে দফায় দফায় ছুটি বেড়েই চলেছে। সে সাথে শুরু পবিত্র মাহে রমজান। মাইকিং করা হলো তারাবির নামাজ বাড়িতেই পড়তে হবে। তাই বাবার সাথে সবাই মিলে বাড়িতেই তারাবি পড়লাম। সেহেরি করেই ঘুমাই। আর ঘুম থেকে উঠে করোনা সংবাদ। লোকজন লকডাউন মানছে না, খুচরা বাজারে সবজির দাম পাইকারি বাজারের কয়েক গুণ। নতুন আক্রান্ত ৩০৯, মৃত আরও ৯জন। এ পর্যন্ত মোট আক্রান্ত সংখ্যা ৪৯৯৮, মোট মৃত ১৪০। বাইরে পুলিশের পাহারা। উপযুক্ত কারণ ছাড়া বাইরে বের হলেই পুলিশের পিটুনি। সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা শরীফ, মসজিদে নববী এবং মসজিদুল হারাম এখনও জনসাধারণের জন্য বন্ধ, সৌদি সরকারের নির্দেশে। এরপর খবরে শুনলাম আমাদের গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র করোনা পরীক্ষার জন্য কীট হস্তান্তর করেছে যা আমাদের জন্য খুবই গর্বের বিষয়। প্রতিনিয়তই আমাদের অনলাইন ক্লাস চলছে। স্যার ম্যামরা প্রতিনিয়তই বাড়ির কাজ আর অ্যাসাইনমেন্ট দিচ্ছেন। আমি সকল কাজই কমপ্লিট করার চেষ্টা করছি। ইফতারির আগে আম্মুকে ইফতারি তৈরিতে সাহায্য করলাম। ইফতারির পর একটু রেস্ট নিলাম। মোবাইল হাতে নিয়ে ফেইসবুকে ঢুকলাম। ম্যাসেন্জারে ফ্রেন্ডদের সাথে পবিত্র মাহে রমজানের শুভেচ্ছা বিনিময় করলাম। এরপর তারাবি পড়ে রাতের খাবার শেষ করলাম।

১মেঃ শুক্রবার ২০২০
মে দিবস। লকডাউনের আজ ৩৬ দিন। নতুন আক্রান্ত ৫৭১ জন, মৃত ২জন। দেশে প্রথম কোনো সংসদ সদস্য করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেল যার নাম মো. শহীদুজ্জামান সরকার। তিনি নওগাঁ-২ আসনের সংসদ সদস্য। একজন পুলিশ সদস্যও মারা গেছেন। খুবই মর্মাহত হলাম। করোনা দিনে দিনে ভয়ানক মহামারীতে পরিণত হয়েছে যার প্রভাবে দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দিচ্ছে। নিম্নবিত্ত, দিনমজুরদের বন্দিদশায় পুঁজি শেষ হয়ে গেছে, তাই তারা রাস্তায় নামছে আহারের সন্ধানে। মধ্যবিত্তদের অবস্থা খুবই করুণ। তারা না পারছে বাইরে কাজে যেতে, না পারছে লজ্জায় কারো কাছে হাত পাততে। প্রথম দফায় সাধারণ ছুটির পর অর্থাৎ ৪ এপ্রিল এর পর গার্মেন্টস ও কারখানা খুলে দেওয়ায় করোনা ভাইরাস এর প্রাদুর্ভাব ভয়ানক ভাবে বেড়ে গেল।

৪মেঃ মঙ্গলবার ২০২০
লকডাউনের ৩৯ তম দিন। ঢাকা শহর তথা সারাদেশ মনে হয় আরমোড়া দিয়ে উঠেছে। ঢাকা শহরের দু একটা মোড়ে সীমিত আকারের যানজটও পরিলক্ষিত হয়েছে। এর মধ্যে শুনলাম ঈদের জন্য সীমিত আকারে দোকানপাটও খোলা হবে। সীমিত শব্দটি বেশ ক্রিয়েটিভ, কখন যে কি বুঝায় তা বুঝা কঠিন। সীমিত আকারে দোকানপাট খোলা হলে, তাতে অসীম আকারে ভিড় জমে। করোনা প্রাদুর্ভাবের প্রথম দিকে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ গণ নানাবিধ তত্ত্ব দিয়ে যাচ্ছিল। কেউ বলছিল মাস্ক পড়তে হবে, আবার কেউ বলছিল আক্রান্ত না হলে মাস্ক পড়ার দরকার নেই। আবার কেউ বলছিল মাস্ক, গ্লাভস দুটোই পড়তে হবে, সাথে পিপিই। এরকম নানা উপদেশে লোকজন প্রায় বিভ্রান্ত। অতঃপর বিভ্রান্তি ঘুচাবার জন্য সরকার টিভিতে চূড়ান্ত নির্দেশনা জারি করলেন, বাইরে বেরুতে হলে শুধু মাস্ক আর গ্লাভস পরলেই চলবে, আর কিছু লাগবে না। টিভি দেখতে আসলেই বিভ্রান্ত হতে হয়। বিটিভির খবরের প্রথমে বলা হলো, ‘করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে’। খবরের শেষের দিকে বললো, ‘বিটিভি মহাপরিচালক করোনা আক্রান্ত’। আজ নতুন আক্রান্ত ৬৮৮জন, মৃত ৫ জন। তবে খুবই আশংকাজনক হলো প্রচুর পুলিশ সদস্য আক্রান্ত। সেনাবাহিনী, পুলিশ সহ যারা মাঠ পর্যায়ে কর্মরত, তাদের নিরাপত্তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সারাদেশের মতো আমিও অপেক্ষায় আছি, কবে হবে সবকিছু স্বাভাবিক। অপেক্ষা বা প্রতীক্ষা খুব কষ্টের, এটা মৃত্যুর চেয়েও ভয়ংকর।

৬ই মেঃ বৃহস্পতিবার ২০২০
লকডাউন এর ৪১দিন। নতুন আক্রান্ত সংখ্যা ৭৯০, মৃত ৩জন। মোট আক্রান্ত সংখ্যা ১১,৭১৯, মোট মৃত ১৮৬। প্রতিনিয়তই আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। সাধারণ ছুটি ৭ থেকে ১৬মে পর্যন্ত করা হলো। টিভি নিউজ দেখার পর একটু ফেইসবুকে ঢুকলাম। গ্রুপে ঢুকেই ফয়সাল, নাইম, শিহাবের ফানি ভিডিও দেখে ভীষণ জোরে হাসলাম। হাসির আওয়াজ শুনে পাশের রুম থেকে আম্মু এসে ইচ্ছে মত ধোলাই করল। বলল, “এই মহামারিতে এভাবে না হেসে পারলে ভাল কিছু কর। অনেকেই যে যার স্থান থেকে পারছে অসহায়দের পাশে দাঁড়াচ্ছে, যারা খাবারের কষ্টে আছে, এই রমজানে না খেয়ে রোজা রাখছে, পারলে তাদের সাহায্য কর। মানুষের কল্যাণে কাজ কর। কে কখন পৃথিবী ছেড়ে চলে যাব ঠিক নেই, নামায, কুরআন পড়ে আল্লাহকে খুশি করার চেষ্টা কর”। আম্মুর কথাগুলো শুনে প্রথমে খারাপ লাগলেও ভেবে দেখলাম খুব মূল্যবান কথা। ছোটবেলা থেকেই আমার একাউন্টে আমার স্কলারশিপের টাকাগুলো আম্মু জমা করত। ৫ম, ৮ম ও ১০ম শ্রেণির স্কলারশিপের টাকাগুলো উঠিয়ে দরিদ্র তহবিলে দিলাম। আমার মামা করোনার শুরু থেকেই অসহায়, দুস্হ, দরিদ্রদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করে আসছেন। সেই সেবামূলক কাজে মামাকে সাহায্য করলাম(চাল, ডাল, স্যানিটাইজার প্যাক করে দিলাম ত্রাণের জন্য)।

১৫মেঃ শুক্রবার ২০২০
লকডাউন এর ৫০দিন। লকডাউন তথা সাধারণ ছুটির অর্ধশতক পূর্ণ। গতকাল করোনায় মৃত্যুবরণ এমিরেটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি। নতুন আক্রান্ত ১২০২, মৃত ১৫জন। মোট আক্রান্ত ২০০০০ ছাড়িয়েছে। মোট মৃতের সংখ্যা ২৯৮ জন। ১৫ এপ্রিল নাক ফোঁড়িয়ে ছিলাম। ফোঁড়ানোর এক সপ্তাহ পর নাকফুলও পরেছিলাম। আজ প্রায় ১মাস পূর্ণ হলো- ক্ষতটা শুকাচ্ছে না, ব্যথাও আছে। নিয়মিত ওষুধ খাচ্ছি তবুও কাজ হচ্ছে না, ব্যথা সারছে না, ইনফেকশন হলো। মনে হয় পরিচর্যার, যত্নের ত্রুটি ছিল হয়তো, তাই এমনটা হলো। আজ আবারও ডাক্তারের কাছে গেলাম। ডাক্তার অনেকগুলো ট্যাবলেট ধরিয়ে দিলেন আবারও, আর নাকের ফুলটা খুলে ফেলতে বললেন। বাসায় ফিরে তাই করলাম, ফুল খুলে ঔষধ নিলাম। দেখা যাক, আল্লাহ ভরসা। হয়তো ফোঁড়ানো ছিদ্রটা আবার বন্ধ হয়ে যাবে। দুপুরে জানতে পারলাম, আমাদের এলাকায় ১জন করোনা পজেটিভ, আমাদের বাড়ি থেকে তার বাড়ি ২মিনিট দূরত্বে। ফলে আমাদের বাড়িসহ এলাকার ৪০ বাড়ি লকডাউন। এতদিন যতটা ভয় না পেয়েছি, এমন পরিস্থিতি দেখে তার থেকে বেশি ভয় পেলাম।

২০মেঃ বুধবার ২০২০
লকডাউনের ৫৫দিন। ১৬১৭ জন আক্রান্ত গত ২৪ ঘণ্টায়। নতুন মৃত ১৬। সাধারণ ছুটি ৩১ মে পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়েছে। এ হলো আজকের পরিস্থিতি। করোনার আতঙ্কে এ বছরের রমজান অন্যান্য বছরের চেয়ে ভিন্ন। দেশের সিংহভাগ জনগণের আয় উপার্জনশূন্য। গত দু এক দিনে করোনার উল্লেখযোগ্য খবর হলো সুরকার আজাদ রহমান আর নেই। “জন্ম আমার ধন্য হলো মাগো”- এমন সুর আর কখনও আসবে কিনা জানিনা। কয়েক দিনের ব্যবধানে চলে গেলেন অনেক বরেণ্য লোক। আল্লাহ তাদের আত্নাকে শান্তিতে রাখুন। ঈদের ছুটিতে সবাই ঘরমুখো। ঈদের সপ্তাহ আগেই ঘরমুখো হওয়াতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শপিং সেন্টারগুলো। উচিত ছিল আগে বেচাকেনা শেষ করা। তারপর খুলে দিতে পারত, মহাসড়কগুলো তাহলে ষোলকলা না, পুরো দুই ডজন কলা পূর্ণ। শিমুলিয়া ফেরীঘাটে ঘরমুখী মানুষের ভীড়, মনে হয় না এমন ভীড়ের মধ্যে করোনা নদী পার হতে পারবে। আজকের মৃত্যু বা আক্রান্তের কথা শুনার পর মনে হয়না কারুরম্য কথা শুনার মানসিকতা আছে। এদিকে ধেয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড় আমফান। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দীঘা উপকূল দিয়ে বাংলাদেশের সুন্দরবনে আঘাত হানে। করোনা টেস্ট, সনাক্ত ও মৃত্যু আগের মতই স্থিতিশীল, কিন্তু এমুহূর্তে আবহাওয়া অস্থিতিশীল, বঙ্গোপসাগরের আম্ফান আরো শক্তিশালী হয়ে এগিয়ে আসছে উপকূলের দিকে এবং আপাত দৃষ্টিতে কিছুটা ডানে মোড় নিচ্ছে, সম্ভবত ভারত বাংলাদেশ সীমান্তেই আঘাত হানবে। এরকম মহামারীর সময় এমন ভয়ংকর সাইক্লোন, কি পরিস্হিতি সৃষ্টি হবে তা কাউকে বুঝিয়ে বলতে হবে না। করোনার চেয়ে গত ক’দিনের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হলো আম্ফান। সংবাদ চ্যানেলগুলো ঘূর্ণিঝড় নিয়েই ব্যস্ত। পশ্চিমবঙ্গে ৭২ জন মারা গেছে, আমাদের দেশে বেশি মানুষ মারা না গেলেও মানুষের ঘরবাড়ি, আম লিচুসহ অনেক ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মনে হচ্ছে দিন দিন যত বেশি আক্রান্ত আর মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে, ততই যেন করোনা আতঙ্ক কেটে যাচ্ছে মানুষের মন থেকে। এটাকে মানুষ এখন সহজভাবে মেনে নিয়েছে। কালকের আগের দু মাস ব্যাপী মানুষ করোনা গাইতো, করোনা বাজাতো, করোনা খাইতো তারপর ঘুমাতে গিয়ে করোনা স্বপ্নে দেখত। এখন আর তেমনটি নেই।

২৫মেঃ সোমবার ২০২০
লকডাউনের ৬০দিন। লকডাউনের ২মাস পূর্তির দিনে ঈদ। খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে সবার আগে দুহাত মেলে গতরাতে ছোটো বোনের পরিয়ে দেয়া মেহেদীর রং দেখলাম কেমন গাঢ় হয়েছে। ফুলের গাছগুলোর পরিচর্যা করলাম। সবাই মিলে সেমাই খেলাম। আব্বু ঈদের জামায়াতে গেল। ফোনে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধবদের সাথে ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় করলাম। আম্মুকে রান্নায় সাহায্য করলাম। এরপর ফ্রেশ হয়ে আব্বুর আসার অপেক্ষা করলাম। আব্বু আসার পর খাওয়া দাওয়া করে রেস্ট নিয়ে সেফটি নিয়ে নানুবাড়ি গেলাম। যাওয়ার পথে দেখি বেশিরভাগ মানুষই মাস্ক ছাড়া ঘুরে বেড়াচ্ছ, তাদের সামাজিক দূরত্বটাও শূন্য ইঞ্চি। নানুবাড়ি গিয়ে মামা-মামি সবার সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করে টিভি দেখতে বসলাম। দেখলাম মৃত্যুর সংখ্যা কমলেও সনাক্তের সংখ্যা এবং হারে নতুন রেকর্ড। যতজন টেস্ট করা হয়েছে তার প্রায় ২১% পজিটিভ। নতুন আক্রান্ত সংখ্যা ১৯৭৫। দেশে মৃতের সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়েছে। হঠাৎ হৃদয় বিদারক একটা নিউজে স্তব্ধ হয়ে গেলাম যখন দেখলাম টিভির বিভিন্ন চ্যানেলের সর্বশেষ আপডেট জাফরুল্লাহ চৌধুরী স্যারের করোনা পজেটিভ। এ সংবাদ শুনে সারা ভার্সিটিতে শোকের ছায়া নেমে গেল। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, উনি যেন দ্রুত সুস্থ হয়ে আমাদের মাঝে ফিরে আসেন। গত দু একদিনে করোনা সংক্রান্ত উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো দেশের শীর্ষস্হানীয় কিছু ব্যক্তির করোনা আক্রান্ত হওয়া এবং মৃত্যু। এস আলম গ্রুপের ৫ভাই, মা এবং এক সন্তান করোনা আক্রান্ত। এর মধ্যে এক ভাইয়ের মৃত্যু। হামীম গ্রুপের আজাদ সাহেব আক্রান্ত। এপেক্স গ্রুপের মালিক স্বস্ত্রীক আক্রান্ত। সর্বশেষ খবর সাবেক এমপি হাজী মকবুল মারা গেছেন। এসবের সাথেই ঈদ উদযাপন হলো। রাতে বাসায় ফিরলাম।

১জুনঃ সোমবার ২০২০
লকডাউন শেষ হয়ে গেছে। সাধারণ ছুটি শেষ। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে। করোনা সংক্রমণের আজ ৮৫তম দিন। নতুন আক্রান্ত ২৩৮১ জন, মৃত ২২ জন। আব্বু খুব ভোরে চলে গেছে বাইরে। আর আমি ঘুম থেকে উঠতে না উঠতেই কাজ শেষে বাসায় ফেরত। রাস্তায় নাকি বেশি জ্যাম ছিল না, লোক চলাচল ছিল সীমিত। ট্রেন, লঞ্চ, বাস চলাচল শুরু হয়ে গেছে ৬০% ভাড়া বাড়িয়ে। শুরু হয়ে গেছে কর্মযজ্ঞ, সাথে থাকবে করোনা আর করোনার সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। সীমিত আকারে বাস চলাচল শুরু হয়েছে ধারণক্ষমতার অর্ধেক যাত্রী নিয়ে এবং ঢাকা শহরে তা মোটামুটি মেনেও চলছে। সবাই যখন করোনা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে, সে সময়ে কারো জন্মদিন কিংবা বিবাহ বার্ষিকীর উদযাপনও হচ্ছে সীমিত। গত ২দিন আগে শান্তা মরিয়ম এবং সুন্দরবন কুরিয়ারের প্রতিষ্ঠাতা ইমামুল কবির মারা গিয়েছেন করোনা আক্রান্ত হয়ে, একজন এমপিও করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। এরপর প্রথম আলো পত্রিকাটি হাতে নিয়ে দেখলাম, করোনা আক্রান্তের একটি নমুনা প্রকাশিত হয়েছে পত্রিকাটিতে। ঢাকা থেকে চাঁদপুর যান এক যুবক। বাড়ি যাবার ২দিন পরেই মারা যায় সে যুবক। নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করলে জানা যায় সে ছিল করোনা পজেটিভ। তার মৃত্যুর দশ দিন পর মারা যায় তার মা, তার দুদিন পর বাবা। হয়ত একজনের উৎস বাকী দুজনের মৃত্যুর কারণ।

৭জুনঃ রবিবার ২০২০
আজ করোনা সংক্রমণের ৯২তম দিন। রেকর্ড সংখ্যক সংক্রমণের দিন, প্রায় তিন হাজারের কাছাকাছি। এখন কোভিড-১৯ ব্যতীত বিশ্বে আর কোনো খবর নেই। গত চার মাসের নানাবিধ আলোচনায় আমরা ভাইরাস ও করোনা নিয়ে যে পরিমাণ জ্ঞানার্জন করেছি, তা গত ৪০ বছরেও কেউ করিনি। প্রতিদিন সোশ্যাল মিডিয়া এবং টিভিতে শুধুই করোনা। কিছু আশার গল্প বাদে সবই নিরাশার, আতংকের ও ভয়ের সংলাপ। নতুন করে এমন কিছু বলার নেই যা মিথ্যা আশার আলো দেখায় কিংবা আরো আতংকিত করে। কিন্তু বাস্তবতা হলো যুদ্ধ এখন আর রণাঙ্গনে সীমাবদ্ধ নেই, শহরে-গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে। জীবিকার জন্য বের হতেই হবে। করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য কোনো সিস্টেমই এখন মনে হয় আমাদের সহায়ক নয়। সুতরাং নিজের নিরাপত্তা নিজেরই নিশ্চিত করতে হবে যতটা সম্ভব। এখনও বের হয়নি কোনো ভ্যাকসিন, তবে ৩-৪ মাসের মধ্যে হয়তো বাজারে আসতে পারে প্রথম ভ্যাকসিন। ভ্যাকসিন আসবে, কিন্তু আগামী দু তিন মাস আমাদের সহনশক্তি কতটা টিকে থাকবে জানি না। খুব ভালো লাগলো যখন শুনলাম ড. জাফরউল্লাহ স্যারের অবস্থা উন্নতির দিকে। আজ নতুন আক্রান্ত ২৭৪৩ ও মৃত ৪২ জন। এ নিয়ে মোট আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে ৬৫,৭৬৯ জন, মোট মৃত ৮৮৮ জন। মৃত্যুর হিসেব আজ সর্বোচ্চ। মন্ত্রী বীর বাহাদুর করোনা আক্রান্ত। নন্দিত ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম করোনা আক্রান্ত। জোন হিসেবে ভাগ করা হয়েছে ঢাকা শহরকে। সে হিসেবে আমি/ সাভার এখনও রেড জোনের বাইরে। গত দু এক দিন আগে শুনলাম, প্রাক্তন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মাননীয় নাসিম করোনা আক্রান্ত। দিন দিন তাঁর পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। সিলেট সিটি করপোরেশনের বর্তমান ও সাবেক মেয়র দুজনের স্ত্রী করোনায় আক্রান্ত। করোনা আক্রান্তদের মধ্যে রয়েছেন একজন এমপি, প্রধান বিচারপতিও ভর্তি হয়েছেন সিএমএইচ এ। এদিকে রানা প্লাজার মালিক আব্দুল খালেক কোয়ারান্টাইনে থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন, সবাই পড়ুন “ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজিউন”। কাজকর্ম শুরু হয়েছে সীমিত আকারে, যানবাহন চলাচলও সীমিত। ঈদ উপলক্ষে শপিংমল খোলার সংবাদে যেভাবে মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, এভাবের সীমিত সিথিলতায় তা দেখা যায়নি। সিলেটের প্রাক্তন মেয়র কামরানও করোনা আক্রান্ত বলা হয়েছে। প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনও অসুস্থ। খবর দেখে সত্যিই খুব খারাপ লাগছিল। তাই একটু বিনোদন পেতে ইচ্ছে হলো। ছোটবোনকে নিয়ে দাবা খেললাম। বিকেলের নাস্তায় দুজনে মিলে জিলাপি বানালাম। প্রথম জিলাপি বানিয়েছি, খেতে কেমন হবে ভেবেই দুশ্চিন্তা হচ্ছিল। কিন্তু সবাই মজা করেই খেলো।

১০ জুনঃ বুধবার ২০২০
করোনা সংক্রমণের ৯৫তম দিন। বলা যায়, অবস্থা অপরিবর্তিত। ঢাকার রাজাবাজারে লকডাউন কঠোরভাবে প্রয়োগ। নতুন আক্রান্ত ৩১৯০জন, মৃত ৩৭জন। ৩১শে মে সুসান ম্যাম এর অ্যাসাইনমেন্ট ছিল; লকডাউনের এক্সপেরিয়েন্স সম্পর্কে লেখা। অনেক বন্ধুই গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার কারণে, অসুস্থতার কারণে অনলাইনে ছিল না। তাই জানতো না অনেকেই যে ম্যাম কি পড়া দিয়েছেন। ৩জুন ৬.৩০টায় হঠাৎ সাঈদ ইনবক্সে নক করল, ‘দোস্ত কী পড়া দিছে ম্যাম?’ ঐ সময় আমি খুব মনোযোগ দিয়ে ম্যাম এর অ্যাসাইনমেন্ট করছিলাম, তাই খুব বিরক্ত হই, প্রচন্ড রাগ হয়। ও মেসেজ করতেই থাকে পরে আমি রেগে গিয়ে অনেক বকি। ও আমাকে লিখে ওর নাকী সর্দিজ্বর, অসুস্থ ভালো লাগছে না, খুব খারাপ অবস্থা। তারপরও আমি ওর কথায় মনোযোগ দেইনি। আমার কাজ শেষ করে যখন ওর মেসেজ দেখি ততক্ষণে ও নেট থেকে চলে গেছে। হয়তো কষ্ট পাইছে পরে বুঝতে পারি। আজ আমি ওর ইনবক্সে নক করি, ‘দোস্ত, কি খবর?’ ওর রিপ্লাই আসে, ‘করোনা যুদ্ধে মোটামুটি জয়ের পথে’। কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলাম। খুব খারাপ লাগছিল। মনে মনে ভীষণ কষ্ট পাচ্ছিলাম ওর জন্য, ও যে করোনা আক্রান্ত ছিল, আমি কেন বুঝতে পারি নাই। আহারে!! বারবার বলছিল, ‘আমি অসুস্থ, সর্দিজ্বর খুব কষ্টে আছি দোস্ত’। কিন্তু আমি ওর কথার কোনো গুরুত্ব দেইনি সেদিন। এসব ভাবতেই নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে বারবার। ক্ষমা করতে পারছিলাম না নিজেকে। মনে হচ্ছিল আমার মত স্বার্থপর বন্ধু যেন কারো না থাকে। ভাগ্যিস আল্লাহ ওকে সুস্থ করে দিয়েছেন, তাই আজ ক্ষমা চেয়েছি। এখন ভাবলে কষ্ট পাই, ইস ওর যদি করোনায় কিছু হয়ে যেত, তাহলে কখনো নিজেকে ক্ষমা করতে পারতাম না।

১৫ জুনঃ সোমবার ২০২০
আজ করোনা সংক্রমণের ১০০তম দিন। দীর্ঘ সময়ে আমরা হারিয়েছি চেনা অচেনা, পরিচিত অপরিচিত, অখ্যাত বিখ্যাত অনেক মুখ। ঘরে আবদ্ধ দীর্ঘ সময়। পৃথিবীর চাকাই প্রায় বন্ধ। গত দু দিনের পরিসংখ্যান স্থিতিশীল। তার পরও উল্লেখযোগ্য একটা রেকর্ড হয়েছে। এটা শুধু জাতীয় রেকর্ড নয়, আন্তর্জাতিক রেকর্ড। একদিনে ১৫০০ লোক সুস্থ হয়েছে। যাক, একটা স্বস্তির খবর পাওয়া গেল। নতুন আক্রান্ত ৩০৯৯, মৃত ৩৮ জন। আরো দুজন পুলিশ সদস্য মারা গেছে। এছাড়া মারা গেলেন সিলেটের প্রাক্তন মেয়র বদরুদ্দিন কামরান। আরো একজন সাংসদ আক্রান্তের খবর এসেছে, তিনি গণফোরাম থেকে নির্বাচন করেছিলেন। মোট পাঁচজন সংসদ সদস্য করোনা আক্রান্ত। এছাড়া ৭০০০ পুলিশ সদস্য আক্রান্ত, ১৯জন মৃত। এর মাঝে মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রী সস্ত্রীক আক্রান্ত হয়েছে। হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের একজন সহকারী অধ্যাপক, বিএসএমএমইউ এর একজন চিকিৎসক এবং একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞ মারা গেছেন করোনা আক্রান্ত হয়ে। খুব সম্ভব ২৯জন চিকিৎসক মারা গেলেন করোনার ছোবলে। ড.জাফরুল্লাহর স্যারের করোনা টেস্ট নেগেটিভ এসেছে। তিনি এখন সুস্থ হয়ে উঠেছেন। ফুসফুসের অবস্থাও কিছুটা ভালো। তবে এই স্বস্তির দিনে আজ সমস্ত জাতি শোকে মুহ্যমান। মাননীয় মহান নেতা, রাজনীতির উজ্জ্বল নক্ষত্র, জনমানুষের বাতিঘর, ১৭ কোটি মানুষের আদর্শ, মহামান্য নেতা নাসিম সাহেব আর নেই। গত দু দিন আগে মারা গেছেন আরেকজন মন্ত্রী ধর্মপ্রতিমন্ত্রী শেখ মোঃ আব্দুল্লাহ। পরে উনার করোনা পজেটিভ এসেছে। আরো মারা গিয়েছেন লিভিং ঈগল সাইফুল আজম এবং স্বাস্থ্য সচিবের স্ত্রী। আজ সম্পূরক বাজেট পাস হয়েছে। যেসব মন্ত্রণালয় বা বিভাগ তাদের জন্য বরাদ্দ করা বাজেটের চেয়ে বেশি খরচ করেছে, তা অনুমোদন দিতেই সম্পূরক বাজেট পাস করা হয়। এবার সম্পূরক বাজেটের পরিমাণ ৪৬ হাজার ৫১৬ কোটি ১১ লাখ ২০ হাজার টাকা। টিভি নিউজ দেখার পর মোবাইল হাতে নিয়ে ফেইসবুকে ঢুকতেই দেখি ভয়াবহ সংবাদ। ১ তারিখ থেকে অনলাইন এক্সাম। খুব টেনশন হচ্ছে। করোনার এ অবস্থায় কিছুই পড়া হয়নি। শুধু অনলাইন ক্লাসগুলো জয়েন করেছিলাম। নিউজটা শুনে বই খাতাগুলো খুঁজতে লাগলাম। অবশেষে পাওয়া গেল।

২১ জুনঃ রবিবার ২০২০
করোনা সংক্রমণের ১০৬ তম দিন। আজ বাবা দিবস। মা বাবাকে ভালোবাসার জন্য কোনো দিবস লাগে না, এরা সব সময়ই ভালোবাসার পাত্র। গতকাল রাত ১২.১মিনিটে বাবাকে শুভেচ্ছা জানিয়ে কিছুক্ষণ এফবি তে থেকে ঘুমিয়ে পড়লাম। সকালে ওঠে দুই বোন মিলে বাবার জন্য কেক বানালাম নিজের হাতে। আর রসমালাই টা গত রাতেই বানিয়ে রেখেছিলাম বাবাকে সারপ্রাইজ দেব বলে দেখাইনি। বাবা বাসায় নেই, আমাদের ঘুম থেকে উঠার আগেই বাইরে চলে গেছে। ফিরেও আসল তাড়াতাড়ি ১২.৩০ মিনিটে। এসে রান্নার কাজে আম্মুকে সাহায্য করলো। আজ বিরিয়ানি ও রোস্ট রান্না হলো। সবার মিলে এক সাথে লাঞ্চ করলাম। তারপর টিভির সামনে বসে রেস্ট নিচ্ছি আর নিউজ দেখছি। গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা সৃষ্টি করছে শোকের ছায়া। প্রতিদিনই করোনায় আক্রান্ত হচ্ছে হাজারো মানুষ, উদ্বিগ্ন হচ্ছে হাজারো পরিবার। আজ নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে ৩৫৩১জন এবং মৃত ৩৯জন। এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ মৃতের সংখ্যা দেখা যায় ১৬জুনে, মোট ৫৩জন। কিন্তু মহামানবদের অসুস্থতায় শোকে আচ্ছন্ন হয় সমগ্র জাতি। আজ এমনই একটি দিন। টেকনাফের জনদরদী নেতা, সাবেক এমপি এবং বর্তমান সাংসদের স্বামী বদি সাহেব করোনা আক্রান্ত। এছাড়া আক্রান্ত হয়েছেন সাংসদ এবং প্রাক্তন সফল, জনমানুষের নেতা, ফরিদপুর অঞ্চলের কৃতি সন্তান, মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশারফ এবং স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি। প্রাক্তন সফল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন আছেন আইসিইউতে। বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুন্সী এবং সাবেক হুইপ আবদুস শহীদ করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। এছাড়া খুবই দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছে, একজন ডাক্তারকে রোগীর স্বজনরা হত্যা করেছে খুলনাতে। তাদেরকে পরে গ্রেফতার করা হয়েছে। করোনায় আরো চারজন ডাক্তার মারা গেছেন। সবার প্রার্থনা সৃষ্টিকর্তার কাছে তাদের আরোগ্য লাভের জন্য। করোনা সম্পর্কিত উল্লেখযোগ্য খবর হলো প্লাজমা থেরাপি বন্ধ হয়ে গেছে। আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয় এন্টিবডি টেস্ট এখনও অনুমোদন দেয়নি। যদিও আমাদের গণস্বাস্থ্যের এন্টিবডি টেস্ট কিট প্রস্তুত, কিন্তু তার অনুমোদন নেই। প্লাজমা পরীক্ষা না করে থেরাপি দিতে ডাক্তাররা আর ইচ্ছুক না, কারণ করোনা থেকে ভালো হয়ে গেলেও, তার শরীরে প্রয়োজনীয় মাত্রায় এন্টিবডি থাকবে, তার নিশ্চয়তা নেই। করোনার আতংকে অনেকদিন হারমোনিটা আর ধরা হয়নি, আজ বাবা দিবসে বিকেল বেলায় একটু বসলাম হারমোনিটা নিয়ে। আমি আর ছোটো মিলে গান গাইলাম বাবাকে নিয়ে। সন্ধ্যায় কেক কাটলাম। সাথে রসমালাই এবং আরো খাবার। এরপর কিছু সময় দাবা, কেরাম খেললাম আব্বুর সাথে। বন্দী ঘরে এভাবেই উদযাপন করলাম দিনটি। প্রতিবারের মত এবারেও ভালোভাবেই উদযাপন করলাম বাবা দিবস।

২৮জুনঃ বৃহস্পতিবার ২০২০
করোনা সংক্রমণের ১১৩তম দিন। নতুন আক্রান্ত ৩৮০৯জন ও মৃত ৪৩জন। উপরের সংখ্যাগুলো দেখলেই বুঝা যায়, করোনা বেশ বুদ্ধিমান প্রজাতির ভাইরাস, যেমনটি বলেছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, “তাইতো ২৫শে মে ঐ ঈদের ব্যাপারটি তার (করোনার) মাথায় ছিল এবং মানুষকে শান্তিতে ঈদ পালন করতে দিয়ে ঈদের পরপরই কাজে নেমেছিলো”।

অনলাইনে পরীক্ষার সিদ্ধান্ত হওয়ার পর স্যার-ম্যামরা পরীক্ষার রুটিন, সাজেশন ও মানবণ্টন দিচ্ছেন। সেগুলো রিভাইস করছি। তবে সাথে আরও একটি নোটিশ দেখলাম, প্রশাসন থেকে সিদ্ধান্ত হয় যে, ভর্তি ফি, পরীক্ষার ফি ও বকেয়া পরিশোধ না করলে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে দেয়া হবে না, এই পরিস্থিতিতে বকেয়া পরিশোধ অনেক শিক্ষার্থীদের মধ্যে চাপ সৃষ্টি করলো। অনেক শিক্ষার্থীরাই টেনশনে ছিল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারবে কিনা। বিষয়টি আমাদের সাধারণ ছাত্র পরিষদের সম্মানিত সভাপতি মোঃ রনি আহমেদ ভাইয়ের দৃষ্টিগোচর হওয়ায় উনি বললেন, “শুধুমাত্র টাকার জন্য যদি কিছু শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিতে না পারে তাহলে আমরা কেউ পরীক্ষা দিব না”। এরপর উনি ছাত্র পরিষদের সদস্যবৃন্দদের সাথে নিয়ে প্রশাসনের সাথে আলোচনা করে এর সমাধান বের করেন এবং সিদ্ধান্ত নেন যে, সকল শিক্ষার্থীকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়া হবে এবং ফি পরিশোধের সময়সীমা বাড়িয়ে ১০জুলাই করেন। শুনে ভালো লাগলো। এখন আমরা সবাই পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারবো।
লাঞ্চ সেরে অনলাইন নিউজ পড়তে গিয়ে দেখলাম, করোনাকে হারিয়ে দিল ৭মাসের আবু হুরায়রা। সুনামগঞ্জের আবু হুরায়রা ও তার বাবা ফজলে রাব্বি একইসঙ্গে করোনা আক্রান্ত হয়। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এ ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেন। গত শুক্রবার দ্বিতীয়বারের মতো টেস্টে করোনা নেগেটিভ আসায় একই দিনে বাবা-ছেলে করোনা মুক্ত হয়ে ঘরে ফিরেছেন। করোনার শুরু থেকে আজ পর্যন্ত খবরে যত মৃত্যুর সংখ্যা দেখলাম, তার বেশিরভাগই সমাজের স্বনামধন্য, ভিআইপি, মন্ত্রী, সাংসদ আর বিখ্যাত লোকজন। দুঃখজনক হলেও এটাই সত্যি যে, নিম্নশ্রেণির অসহায়, দরিদ্রদের মৃত্যুর সংবাদ খবরে খুব একটা প্রচার হয়নি। নিউজ দেখা শেষ করে একটু রেস্ট নিলাম। বিকেলে হালকা নাস্তা করে স্যার-ম্যামদের সাজেশনগুলো দেখলাম। দিনশেষে প্রতিদিনের কার্যলিপিটা করোনাকালীন ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ করি। এভাবেই আমার করোনাকাল অতিবাহিত হচ্ছে।

আজ ২৮ জুন শেষ হতে যাচ্ছে। জানিনা আগামীকালের দিন কীভাবে শুরু হবে। আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করুন।– আমিন।
আমাদের প্রবল ইচ্ছাশক্তি এবং সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনাই পারে আমাদের এই কঠিন পরিস্থিতি থেকে মুক্তি দিতে।

———————————–
লেখক:
মারুফা ইসলাম সেতু
ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ
১ম সেমিস্টার, ২৮তম ব্যাচ
গণ বিশ্ববিদ্যালয়, সাভার, ঢাকা।

নিউজটি শেয়ার করুন।

print

Share this post

post bottom

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

five × 4 =