খাতুনে জান্নাত এর পাঁচটি মধুময় কবিতা

post top

কবিতা খাতুনে জান্নাত:

বিন্যস্ত
১.
এ দেহে আগুন ছিল। কষ্টের কল্পদ্রূম। জ্যোৎস্নায় ভেসে গেছে কিছুটা। কিছুটা ছল ও ছুতোয় গুটিসুঁটি মেরে থাকে। তোমাকে শোনানো হলো না গান পঞ্চদশীর কালে। শুধু খরা ও জলোচ্ছাসে ঘরভাঙা-গল্প।
২.
সুখ গচ্ছিত রেখেছি তোমার কাছে। তুমি অাঁজলা খুলে দিলে কোথায় যা্ই বলো…
৩.
তুমি শরতের রোদ ; গা খুলে দাঁড়া্ই তবে, তবে কি পাড়ায়-পাড়ায় ঘাম ও ঘেন্নার গল্প শুরু হবে!
৪.
বিরহে বিবর্ণ পথ। ময়ুরাক্ষী নদী হ’য়ে কে তবে যায়! আশার গুঞ্জরণ ব’য়ে কার মন এ্ইমাত্র বাড়ল সামনে।
৫.
অপেক্ষায় অপেক্ষায় আরেকটি সকাল বিরহী হল।
৬.
তোমার পায়ের শব্দে রাতের শরীরে কত আনন্দাশ্রূ জমা হল; তুমি বুঝতেই পারলে না।
৭.
পুরাতন স্মৃতি যক্ষের ধনের মতো আগলে রেখেছি, কৌটা খুলে দেখি তার উপর দূর্বাঘাস; এবার সরস্বতীকালে পুজোয় বসবো।
৮.
তুমি শিখিয়েছিলে দ্বিতীয় ভোরে প্রজাপতির নীড় বাঁধবার কাল, প্রজাপতি গন্ধ মেখে সুতো হাতে সেই তো ঘুরে বেড়াচ্ছি।
৯.
ইচ্ছে করে তোমাকে জড়িয়ে কিছু আদিচিহ্ন এঁকে দেই, অলঙ্কার সমেত; তুমি অনাদি কাল থেকে মিশে আছো অনন্ত–স্মৃতি ও স্নেহাতুর চোখের ভাষায়।
১০.
পুরাতন কথাগুলো তাড়িয়ে দি। তারা ফিরে-ফিরে আসে, যেভাবে আমি তোমার নিমিত্তে ; তোমার আলোকিত মুখে কত আর চন্দ্রফোঁটা দেবো!
১১.
আমার বালিশে একটুকরো জ্যোৎস্না ফেলে গেছো ভুলে–সেদিনই প্রথম বুঝলাম তুমি চাইলেই পারো আকাশটাকে সুগন্ধি রুমাল বানিয়ে আমার হাতের মুঠোয় পুরে দিতে!
১২.
তুমি ভোর কিংবা বিভোর যাই হও তুমি তো এসেছো; চৈত্রের বাতাস জানিয়ে দিল সে কথা। বিনির্মাণের কঠিন পাথরে মাথা ঠুকে-ঠুকে দেরিতে হলেও ফুটে আছে কিছু ঘাসফুল।
১৩.
আমাকে সহজ করে তুমি আর কি দেবে নতুন; তোমার আসলও তো অনেক আগেই খু্ইয়ে বসেছো। তার চেয়ে এসো স্মৃতি-মোহনায় রজনীগন্ধার চারা লাগাই; প্রজাপতির বংশবৃদ্ধি হোক।
………………………………………………………………………………………
বিরহ
১.
তুমি সুখনিদ্রায় জড়িয়ে আছো বলে আমিও ডুবতে চাই নিদ্রাবিভায়। নিদ্রা বুঝে নিক নিদ্রাহীনতার নিদারুণ বোঝা, বোঝাতে না পারার ভার। বুঝতে-বুঝতে সূর্য ঢলে, বয়স বয়সভারে।
২.
বুকের ভেতর আহত আর্তনাদ আর পাখির ডানা ঝাপটানো। তবে কি পাখির হৃদয় পেয়েছি আমি! মনের বেদনা কলাপাতায় মুড়ে তোমাকে দেখাতে চাইলাম। বললে– রেখে দাও। কোথায় রাখবো বললে না একবারও!
৩.
কতটা সময় ধরে তোমাকে দেখলাম; তুমি পৃষ্ঠার পৃষ্ঠা উল্টে যাচ্ছো; যেন জীবনটাকেই বাজি ধরেছো এবার।
৪.
আমাকে বুঝলে না…ক্ষতবিক্ষত শরীরে নুন মেখে কাঁটা, ঝোপ ও জঙ্গলে ছড়িয়ে দিলাম। আকাশের ওপারে আকাশ আর নক্ষত্র শতদলে আরামে ঘুমিয়ে থাকা তোমার চোখ ও চিবুকে সহস্র চুমুর চিহ্ন এঁকেছিল প্রেমপ্রতিজ্ঞা। এসব ছাঁই -ভস্ম হ’য়ে কাল-কাল ধরে নালা নর্দমায় প্রবাহিত হতে থাকলে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসে মৎস্যপুত্রেরা…
৫.
তার ভুলে যাবার খবর শুনে একটুও কাঁদল না মন। আমি তো আমাকে ভুলে বসে আছি সে কবেই।
৬.
সম্পর্কটা অনেক আগেই বেহাত হয়েছিল, সে এসে সুৃতোটা খুলে দিল বলে শুধু-শুধু তাকে দোষ দিও না।
৭.
তার অন্তর্ধানের খবর রিপোর্ট করা হলো না বলে পুলিশ আমাকে শাসিয়ে গেল। আমি যে অন্তর্হিত হয়ে আছি সে রিপোর্ট করবো কোথায়!
৮.
প্রদীপটা নির্ভাবনায় জ্বলছে। সে জানে তার সাথে চলতে-চলতে রাত সকালের কাছে ঠিকই পৌঁছে যাবে। অথচ ক্রন্দন জানে না হৃদয় নির্মলতায় ভরে দেবার কথা। তুমি কি জেনেছো জানিনে তা। শুধু জানি, কিশোরী দিনগুলোকে হাসুলি পরিয়ে হাসতে-হাসতে প্যাভিলিয়নে ফিরে গেছো।
৯.
তুমি আমাকে যতবার আঘাত দিয়ে দিশেহারা করো ততবার একটি কবিতার সৃষ্টি হয়। আসো আমরা পরস্পরকে আঘাতে-আঘাতে ক্বিক্ষত করি; আর ছড়িয়ে দেই কবিতাকে, ঘামবন্ধ পৃথিবীর দিকে…
১০.
তুমি এলে না; বিকেলটাকে ধান শালিকের পাশে রাখলাম। ওরা খুঁটে-খুঁটে খায় শস্যদানা যেমন আমরা পরস্পরের কথা…হেমন্ত ঢলে পড়লো বলে; তারপর তুষারকন্যা—বিরহের বিপন্নতা জড়ো করে তার গলায় মালা পরা্বো–কারও কাছে চাইবো না ভোর—তার দাফন হয়েছে অনেক আগেই…

……………………………………………………………………………………..
বিমূর্ত
১.
খরায় পুড়ছে শহর ও শহরতলী। কাকের কর্কশ স্বরে মিশিয়ে দি দহনপোড়া চিৎকার; কেউ শুনতেই পায় না।
২.
ঘেটুপুত্রের কাছে শিখেছি দুঃখগুলোকে কৌতুকে উড়ানো ঔদার্যের কথা। রাতভর দুঃখ মেখে গড়িয়ে পড়া দেহপসারিণী সকালের রোদে ধুয়ে নেয়, অবলীলায়। তার মনের বৃষ্টিতে ধুয়েছি সকাল, কতকাল।
৪.
উঠে দাঁড়াতেই কয়েকজন যুবা আমাকে পায়ের বুটে পিষে চলে গেল। সেই থেকে ধুলো হ’য়ে আছি। মাঝে মাঝে তোমাদের চোখে পড়ি…
৫.
ভোরের আলো ফুটতেই এ পাড়ার মেয়েরা গান গা্ইতে-গাইতে পাথর ভাঙতে যায়। একটাও পাথর ভাঙা হয়নি আমার। সবকটা পাথর বুকে গেঁথে এ-ঘর ও-ঘর করি।
৬.
পরীক্ষায় নকল হয়, নকল প্রশ্নও পাওয়া যায় অনলাইনে রেঁস্তরা ও রাস্তায়। সের, ছটাক, পোয়া ও গ্রাম দরে বিক্রি হয় মগজ ও মনন; আমরাও ভুল বানান ও ভুল হরফে এর-ওর হাতে ফেরি হই। নকল ফুলের মতো চেয়ে থাকি দুর্বোধ্য সম্পর্কের দিকে…
৬.
অঘ্রান বিদায়ী সুর ভাঁজতে-ভাঁজতে বাতাসে মিশিয়ে দিচ্ছে শীতের কণিকা। তার সাথে বদলে যাচ্ছে আমাদের পোশাক,প্রাতরাশ, বিকেলের আয়েস, রাতের ঘুম। শুধু শ্রেণিবৈষম্যের পীড়নটা ঘুরে ফিরে আসে।
৭.
বৃষ্টি এক পাগলী মেয়ের নাম। তার শরীরটাকে সারাতে গিয়ে মনকে বলাৎ্কার করে যে এলো সে এখনো অহিংসা ও সাম্যের কথা বলে!
৮.
রোদের দহন সয়েছো কখনো? এই যে সোমত্ত মন পুড়ে যায়, গলে যায়; গলে-গলে মিশে যায় ঘাম ও গরলে… তোমরা মাঝেমাঝে অমৃত মনে করে পান করতে বসো।
৯.
কাল সারারাত বৃষ্টিরা কাঁদলো।

…………………………………………………………………………………….
বিহ্বল
১.
কবেই নিজস্ব কক্ষপথ ছাড়িয়ে এসেছি। এখনো ভোরের বাতাসে শৈশব ঘ্রাণ, দুপুরের জারুল ফুল। ও পাড়ার মাসি-পিসিরা উলুধ্বনিতে মাতিয়ে রাখতো সন্ধ্যাটাকে; তাদের পায়ের ছাপে কতকালের গল্প! এখনো পাথুরে পথের ছায়ায় সে ধ্বনি-প্রতিধ্বনি…
২.
পুলি-পিঠা-পায়েসের কাছে জমা রেখেছি মায়ের স্নেহ। তাল, তমাল ও তেঁতুই পাতা আর পাখিদের ঠোঁটে শৈশবের উচ্ছলতা। শীতের সকালে রোদ পোহাবার প্রহরের কাছে মুড়ি, চিঁড়া খাবার আহলাদ আর পিছু নেয়া মুরগির আঁচড়ে-কাটা ক্ষত থাকুক শৈশবের আঙুলে।
৩.
সন্ধ্যার কাছে ফেরত চেয়েছি ঘরে ফেরা বাসনার কথা। শিরিষ শাখায় শেষ বিকেলের ছায়া। বাল্যসখী তোমার গোধূলি-চোখে বিদায়ী কাতরতা। তুমি ভালো থেকো।
৪.
কেমন আছো খোয়াসাগর দিঘি? গাঁয়ের বৌ’দের গোসলের গল্প আর সিঁদুরধোয়া জল। কুমার বাড়ির ঋতুবতী মেয়েটিকেও দিও ঠাঁই মূর্হুমূহু ঢেউয়ে…
৫.
কাটতে-কাটতে কাটিয়ে এসেছি শহুরে কঙ্কর ও কাঁটাতার। ও আমার বাটুই ফুল, পাকা জামরুল উঠে আসো শহরের খোপে; সন্ধ্যার সুগন্ধি আর জাফরান রঙে একাকার হোক ক্লান্তির বিনিময়ে ক’ফোঁটা ঘামের দাম।

………………………………………………………………………………………
বিচ্ছিন্নতা
.
১.
নামটা হারিয়ে গেছে পাশা খেলার রাতে। পুঁটি পাতা হ’য়ে ডাকছি তোমায় হে আমার বাল্যসখা ছাগল ছানারা। হাঁটের মাঝে বিকিকিনিরত কৃষাণী বোনটি —এক সাথে কত পথ উড়িয়েছি—
২.
হারিয়ে ফেলেছি চলবিদ্যুৎ। মোমবাতি ও চেরাগ জ্বালাবার সুতা সরিয়ে রেখেছো। কেটে যাচ্ছে মৌপ্রহর; মৌমাছিরা মরে গেছে কবেই সরিষার ক্ষেতে— অনিয়মতান্ত্রিক কিটনাশকে—
৩.
কাল ভোর হলে নদীর ছবি আঁকব। নদীর নাভিতে রেখে এসেছি সাঁতার। এখনো ভোরের বাগানে হল্লা করে পাতিহাঁস কাল। মা আমার কাঁচাআম-দুধ মেখে আজও অপেক্ষা করে স্কুলফেরত বিকেলে—
৪.
কুঠারের কোপে কত সাবাড় হলো বাগান। মাটির ডিবি হতে মাটি ও সিমেন্ট। তোমাদের ভাস্কর্য বানানো হলো না জনকজননী। জানোই তো শিল্পের আঙুল কেটে ফেলা হয়েছে চৌদ্দ ডিসেম্বরে…
৫.
তোমার ঘাড়ে ও গর্দানে চাপাতির কোপ। হে আমার সহোদর আমি তো কাটা গলা নিয়ে ধর্না দিচ্ছি সচিব ও সম্পাদকের টেবিলে-মহলে।
৬.
বাইরে কুয়াশা বৃষ্টির শব্দ! শব্দের গভীরে মাছের সাঁতার। মাছেরা হারিয়েছে সমুদ্রের পথ। সরকার খাল খনন কর্মসূচী শুরু করবে আবার…
৭.
মা-বাবা শুয়ে আছে যৌথ কবরে। সময় হলে ছেলেরাও শোবে। মেয়েদের নাকি কবর কিনে নিতে হবে। আসো বোনেরা একই কেটলিতে বিগলিত হই। পিতার কবরে বাসক গাছের গোড়ায় ঢালি মেয়েজল।
৮.
শব্দের ঝাঁকুনিতে তোমাকে ভুলে গেছি। পাশবালিশে শুয়ে থাকা কথা ছুঁয়ে দেখি তার গায়ে নক্ষত্রের গুড়ো…

print

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

18 + sixteen =